অভিযানে যাওয়ার আগে মায়ের কাছে দোয়া চেয়েছিলেন সেনাসদস্য তিতাস

Published: November 6, 2026, 9:26 am

কক্সবাজারের টেকনাফে অপহৃতদের উদ্ধার অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের অতর্কিত গুলিতে মো. তিতাস শেখ (২৮) নামের এক সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এই মর্মান্তিক সংবাদে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে চারপাশ। তিতাস লস্করদিয়া ইউনিয়নের আফজাল হোসেন ও রেখা বেগম দম্পতির বড় ছেলে ছিলেন। তার বাবা নিজেও একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য এবং ছোট ভাই আকরাম হোসেনও সেনাবাহিনীতে কর্মরত। তিতাস ২০১৭ সালে সৈনিক পদে যোগ দিয়েছিলেন এবং চার বছর আগে সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের কোনো সন্তান নেই।

পরিবার ও স্বজনদের স্মৃতিতে এখন তিতাসের শেষ কথাগুলো। গত বুধবার রাতে মায়ের সঙ্গে ফোনালাপে তিনি জানিয়েছিলেন, পরের দিন বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেবেন। মায়ের কাছে সে সময় তিনি দোয়াও চেয়ে নেন। কিন্তু সেই কথোপকথনই যে ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি মা রেখা বেগম। ডিসেম্বরের মধ্যে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল তিতাসের, যা আর পূরণ হলো না। কিন্তু একটি অভিযানে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করায় অপূর্ণই থেকে গেল তাদের একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন। তখন তিনি মাকে বলেছিলেন, ‘আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা। ’ ছেলের মুখে এমন কথা শুনে মা রেখা বেগম দোয়া করেছিলেন।

আইএসপিআর ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেলে টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার পাহাড়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রায় ১২০ জন জিম্মিকে উদ্ধার করাই ছিল এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে যৌথ বাহিনী সেখানে পৌঁছালে মানবপাচারকারী চক্র ও পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা গুলি বর্ষণ শুরু করে। দুই পক্ষের লড়াইয়ের সময় বুকের বাঁ পাশে ও কাঁধে গুলিবিদ্ধ হন তিতাস। তাকে তাৎক্ষণিকভাবে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য রামু সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার গহিন পাহাড়ে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে জিম্মি করে রাখা রোহিঙ্গাদের উদ্ধারে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও ১৬। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে করে রামু সিএমএইচে নেওয়া হয়। আটক করা হয় মানবপাচারকারী চক্রের কয়েকজন সদস্যকে।

অভিযান চলাকালে জিম্মি থাকা ৫৭ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়াও ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়েছে। তিতাসের ছোট ভাই আকরাম হোসেন ইতোমধ্যে রামু সিএমএইচ থেকে শহীদের মরদেহ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছেন। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় হেলিকপ্টারযোগে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকাল ৪টার মধ্যে গার্ড অব অনার প্রদানের পর পারিবারিক কবরস্থানে তিতাসকে সমাহিত করা হবে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তিতাসের পরিবারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় হেলিকপ্টারযোগে তিতাসের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।