নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা হ্রাসের পেছনে মূল কারণগুলো কী?

Published: November 4, 2026, 12:56 pm

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তার নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সেই চিত্র পাল্টে যায়। সেবার ২৪০টি আসনে জয়ী হয়ে তাকে সরকার গঠনের জন্য জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। যদিও বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করে এবং মোদি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবুও এই নির্বাচনী ফলাফল তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং সরকারের কর্মদক্ষতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। মোদির রাজনীতির অন্যতম শক্তি ছিল তরুণ প্রজন্মকে উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের মুখে মোদি সরকার বিতর্কিত তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনী বিশ্লেষণেও অগ্নিবীর প্রকল্পকে বিজেপির জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কংগ্রেস এককভাবে ৯৯টি আসন পায় এবং সমাজবাদী পার্টিসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দল গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করে।

জনপ্রিয়তা হ্রাসের এই প্রবণতা বুঝতে হলে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ প্রয়োজন। প্রধানত কর্মসংস্থান সংকট, ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য, কৃষি খাতের অস্থিরতা, সামাজিক মেরুকরণ এবং রাজনৈতিক বয়ান পরিবর্তনের প্রভাব এখানে স্পষ্ট। কিন্তু শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক গতিশীলতার মধ্যে প্রত্যাশিত সমন্বয় না ঘটলে সেই স্বপ্ন হতাশায় রূপ নিতে পারে।

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কর্মসংস্থানের অভাব মোদি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেকে প্রত্যাশিত চাকরি পাচ্ছেন না। সরকারি নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা এবং বেসরকারি খাতে কাজের সুযোগের সীমাবদ্ধতা তরুণদের হতাশ করছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ইন্ডিয়া টুডে–সিভোটারের জনমত জরিপ অনুযায়ী, ২৭ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা বেকারত্বকে সরকারের প্রধান ব্যর্থতা বলে মনে করেন। তরুণদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান। ২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে প্রকাশিত লে মঁদের এক প্রতিবেদনে ভারতের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব সুযোগের ব্যবধান এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদী মনোভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। ভারতের রাজনীতিতে কৃষকসমাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনীতে স্থায়ী চাকরি, পেনশন ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনের প্রত্যাশা থাকা অনেক তরুণ নতুন ব্যবস্থাকে অনিশ্চিত হিসেবে দেখেছেন। ২০২৫ সালের আগস্টের জনমত জরিপে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভীতিকে সরকারের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

অর্থনৈতিক চাপের অন্যতম দিক হলো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের উচ্চমূল্য নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। একই জরিপে ২৩ শতাংশ মানুষ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ভারতের খুচরা মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশে পৌঁছানো সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির নিশ্চয়তা দেয় না। খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে।

শিক্ষিত বেকারত্বের পাশাপাশি অগ্নিবীর প্রকল্পের মতো নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে তরুণদের অসন্তোষ রয়েছে। সেনাবাহিনীর এই স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অনেকেই অনিশ্চিত মনে করছেন। এছাড়া কৃষকদের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং গ্রামীণ অর্থনীতির টানাপোড়েন বিজেপির ভোট ব্যাংককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশের মতো কৃষিনির্ভর অঞ্চলে বিজেপির আসন কমার পেছনে এটি একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়া তরুণদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। ২০২২ সালে এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ হয়েছিল। কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, কৃষিঋণ, উৎপাদন ব্যয় এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধির প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। বিরোধীরা অভিযোগ করে আসছে, মুসলিমসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতপাত ও সংরক্ষণ ইস্যু বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর প্রচার ছিল যে, বিজেপি ৪০০ আসন পেলে সংবিধান ও সংরক্ষণব্যবস্থা পরিবর্তন করবে। যদিও বিজেপি এটি অস্বীকার করেছে, তবু দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর একাংশের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। এর পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও সমাজে বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। উত্তরপ্রদেশে দলিত, অনগ্রসর শ্রেণি ও মুসলিম ভোটের বিরোধী জোটের দিকে সরে যাওয়াও বিজেপির আসন কমার একটি ব্যাখ্যা। এই রাজনীতি একাংশের কাছে সমর্থন তৈরি করলেও অন্য অংশের মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ, সংখ্যালঘু অধিকার ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির ৩৭০ এবং এনডিএর ৪০০ আসন অতিক্রমের প্রচার প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছিল।

মণিপুর সংকট কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২০২৩ সালের মে মাস থেকে চলা এই সহিংসতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এছাড়া রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র উত্থান এবং বেকারত্ব ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো ইস্যুগুলো বিজেপির একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে। ২০২৩ সালের মে মাস থেকে মণিপুরে মেইতেই ও কুকি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বড় সংকট তৈরি করে। এই সংকট উত্তর-পূর্ব ভারতের বাইরে জাতীয় পর্যায়েও সরকারের জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে প্রশাসনিক কাজের দায় সরাসরি মোদির ওপর এসে পড়ছে। এছাড়া নির্বাচনী প্রচারণায় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও স্থানীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভও বিজেপির আসন সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ।

জনপ্রিয়তা মাপকাঠিতেও এই হ্রাসের তথ্য স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত ইন্ডিয়া টুডে–সিভোটারের জরিপে মোদিকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পছন্দ করেছেন ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ, যা জানুয়ারির ৫৫ শতাংশের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কম।

তার কাজের প্রতি সন্তুষ্টির হারও ৬ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে।

উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রে সিএমআইইর অক্টোবরের জরিপ অনুযায়ী, মোদির কাজের অনুমোদন গত এক বছরে ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ পয়েন্ট কমে ৪৬ দশমিক ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যান নির্বাচনের ফলাফল এবং সরকারের সামগ্রিক কর্মসম্পাদনের ওপর ভিত্তি করে জনমতের পরিবর্তনের একটি প্রতিফলন মাত্র।