কাতারের রাজধানী দোহায় তৃতীয় দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য ইরানের জব্দকৃত ৬০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ অবমুক্ত করার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনার পথ তৈরি করা। যদিও সমঝোতার চেষ্টা চলছে, তবুও এই প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা যেকোনো ধরনের খারাপ পরিস্থিতির জন্য আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য এই মহান জাতি শত্রুদের যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরান কিংবা তার কোনো প্রতিবেশী দেশের স্বার্থে নতুন করে উত্তেজনা কাম্য নয়। তবে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা মাথায় রেখে দেশটি সব ধরনের প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। গারগাশ বলেন, আমরা আগেও যেমনটা প্রমাণ করেছি, এবারও সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। প্রতিবেশী হিসেবে ইরানের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখাকেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তবে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে তার জন্যও প্রস্তুতি রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ইরান জড়িয়ে পড়ুক, তা তারা চান না। এ প্রক্রিয়ার সময়সীমা সাত দিন থেকে কমিয়ে দুই দিনে আনতে সম্মত হয়েছে ইরান। সোমবার তাঁর তুর্কমেনিস্তান যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরানকে খুব একটা নির্ভরযোগ্য মনে হয় না। দ্য গার্ডিয়ান-এর কূটনৈতিক সম্পাদক প্যাট্রিক উইনটুরের প্রতিবেদন অবলম্বনে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি উত্তপ্ত রয়েছে। শুক্রবার পাকিস্তানের পথে থাকা কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই তেহরান জাহাজটিকে নিরাপদে চলাচলের জন্য সরাসরি ছাড়পত্র দিয়েছিল। এমন অস্থিতিশীল পরিবেশের মধ্যেও কাতার তাদের মধ্যস্থতার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও পরমাণু আলোচনার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হবে। কিন্তু বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনার কিছু অংশে অবৈধ বোমা হামলার মুখে পড়তে হয়েছে।’।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সরাসরি এই আলোচনায় অংশ না নিলেও তাঁর দেশের প্রতিনিধিরা দোহার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। আরাগচি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের যুক্তিবিচারের ওপর নির্ভর করে তেহরান প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি উভয় পথেই এগোতে প্রস্তুত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনার পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত নেই। শনিবার আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রস্তাব দেন, তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের সম্পদ হস্তান্তরে বাধা দূর করা এবং তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে মাত্র দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন অন্য পথের পরিবর্তে কূটনীতিকে বেছে নেয়, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা। হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আলোচনার বিষয়ে মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার আলী নিকজাদ ঘোষণা করেছেন, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসার কোনো ইচ্ছা বা সম্ভাবনা নেই। তিনি দাবি করেন, চাপের মুখেও পরমাণু ইস্যুতে ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে ইরান। দেশটির নিরাপত্তা প্রধান মোহসেন রেজায়ি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছ থেকে আলোচনা শুরুর বিষয়ে একটি চিঠি পেয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তা বা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যদিও চিঠির কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব এখনো দেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের ‘সুরে’ ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করেছেন বলেও জানান রেজায়ি। শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে তিনি বলেন, ‘আজ ট্রাম্প যেখানেই যান, তাঁকে জবাব দিতে হয়—কেন তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় একটি অংশ ধ্বংস করা হয়েছে এবং কিছু লক্ষ্যবস্তু এখনো বাকি রয়েছে। তবে এখনো এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবস্থা নেওয়া বাকি রয়েছে।
তবে তিনি এও যোগ করেন যে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা ভালোভাবেই চলছে।
ট্রাম্পের এমন মিশ্র বার্তার পাশাপাশি ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান রেজায়ি দাবি করেছেন, ট্রাম্প বর্তমানে এমন এক যুদ্ধের চাপে রয়েছেন যার প্রভাব ভিয়েতনামের চেয়েও বিস্তৃত।
তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো পরিবার নেই যারা ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বা সামাজিক চাপের বাইরে রয়েছে। আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই এই পরোক্ষ আলোচনা কোনো যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছায় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।





