হার্ভার্ডে ভর্তির স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা, প্রাণ গেল পাকিস্তানি তরুণীর

Published: November 3, 2026, 6:33 am

যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন পাকিস্তানের ২৪ বছর বয়সি তরুণী লাইবা ইজাজ। কিন্তু সেই স্বপ্নই তাঁর জীবনের করুণ পরিণতি ডেকে এনেছে। লাইবা পদার্থবিজ্ঞানে স্বর্ণপদক পাওয়া একজন অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ইসলামাবাদের সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ থেকে নিজের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি একটি স্কুলে বিজ্ঞান পড়ানোর পাশাপাশি দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাসায় টিউশনি করতেন। বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে লাইবা ও তাঁর পরিবার সর্বস্ব খোয়ায়, আর শেষ পর্যন্ত গত ৯ অক্টোবর ইসলামাবাদে নিজের বাড়ির কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর নিথর দেহ। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে জানান, প্রতিদিন সকালে বাবার জন্য চা বানিয়ে দিতেন লাইবা। ঘুমানোর আগে বাবার কাঁধও মালিশ করে দিতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বর্ণপদক পাওয়ার দিন বোনদের সামনে আনন্দে নেচে ও লাফিয়ে উঠেছিলেন তিনি। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনের ‘ওপেন ডোরস’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৩ হাজারের বেশি পাকিস্তানি শিক্ষার্থী ভর্তি ছিলেন।

লাইবার বাবা রানা মুহাম্মদ ইজাজ দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসলামাবাদের জি-১০ এলাকার ‘রানা মালিক সেন্টার’ নামের একটি দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের দোকানের ওপরের ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা ইজাজ ও দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া তাঁর স্ত্রীর চার মেয়ের সবাই উচ্চশিক্ষিত। পরিবারের মেজ মেয়ে লাইবা যখন সৌদি আরবে স্নাতকোত্তর পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন ইজাজ সানন্দে রাজি হন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তীতে নোমান নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয়ের পর লাইবার স্বপ্নের নতুন মোড় ঘোরে এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

প্রতারণার সূচনা ও জালিয়াতির জাল

চলতি বছরের শুরুর দিকে ইসলামের প্রধান ব্যবসায়িক এলাকা ব্লু এরিয়াভিত্তিক একটি কল সেন্টারে কাজ করার সময় নোমানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে লাইবার। পরে নোমান ইজাজের দোকানে নিয়মিত দুধ ও দই কিনতে আসার সূত্র ধরে তাঁদের পারিবারিক পরিচয় তৈরি হয়। লাইবার বিদেশে পড়ার পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে নোমান নিজেকে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একজন কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করেন এবং ভুয়া চাকরির পরিচয়পত্র দেখান। তিনি জানান, সরকারি পদে থাকায় তাঁর আলাদা কোনো ভিসা বা কনসালটেন্সি লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই। নোমান অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লাইবাকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করেন। তাঁদের একজন বৃত্তি নিয়ে চীনে গিয়ে ম্যান্ডারিন ভাষা শিখছেন। ইজাজের স্মৃতিতে, মেয়ে তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি নিজেই সব কাজ করেছি, টিউশনিও করাই। ইজাজের ভাষায়, ‘এটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল।’। নোমানের মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও ইজাজের কাছে এটি কিছুটা হলেও ন্যায়বিচার পাওয়ার মতো ঘটনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বাবদ প্রথমে নোমানের হাতে ২২ লাখ রুপি তুলে দেন ইজাজ। কিছুদিন পর নোমান দাবি করেন যে, হার্ভার্ডে আবেদনের প্রমাণ হিসেবে ব্যাংক হিসাবে অন্তত ৭২ লাখ রুপির আর্থিক সংস্থান দেখাতে হবে। মেয়ের ভবিষ্যের কথা ভেবে ইজাজ নিজের একটি জমি এবং পরিবারের সোনার গয়না বিক্রি করে দেন। নোমান লাইবার হাতে যেসব নথিপত্র তুলে দিয়েছিলেন, তার মধ্যে হার্ভার্ডের ভর্তির ভুয়া প্রস্তাবপত্র, বৃত্তির সনদ এবং বোস্টনগামী বিমানের একটি টিকেটও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নোমান ১২ লাখ টাকার স্কলারশিপসহ চূড়ান্ত ফাইলের বিবরণী তুলে দিয়ে পুরো পরিবারকে বিশ্বাস করান। পরিবারের গয়নাও বিক্রি করেছি, যাতে চাওয়া ৭২ লাখ রুপি জোগাড় করতে পারি।’। এর মধ্যে হার্ভার্ডের ভর্তির প্রস্তাব ও বৃত্তির চিঠি, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনসংক্রান্ত একটি ফরম, নিউইয়র্কে বসবাসকারী এক আত্মীয়ের স্পনসরশিপের হলফনামা, লাইবার ছবি সংবলিত দূতাবাসের একটি নথি এবং বোস্টনে যাওয়ার বিজনেস ক্লাসের বিমানের টিকিট ছিল।

প্রতারণা উন্মোচন ও করুণ পরিণতি

অক্টোবরের শুরুর দিকে লাইবার ভিসা সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করতে নোমানকে ফোন করেন ইজাজ। নোমান তখন কোয়েটায় আছেন জানিয়ে পরদিন যোগাযোগের আশ্বাস দেন। কিন্তু নোমানের আচরণে সন্দেহ হলে পুরো পরিবার নথিপত্রগুলো ইসলামাবাদের একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত ট্রাভেল এজেন্সিতে নিয়ে যায়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এজেন্টরা জানান, নথিপত্রে থাকা এয়ারলাইন্সের বুকিং কোড ভুয়া এবং বিমানের টিকিটটি পুরোপুরি জাল। মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে লাইবা ও তাঁর পরিবারের সব আশা।

গত ৯ অক্টোবর শুক্রবারের নামাজের সময় লাইবা তাঁর বাবাকে জানান যে, নোমান তাঁকে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন এবং টাকা ফেরত দেওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে চান। ইজাজ বিষয়টি এড়িয়ে যেতে বলেন এবং মেয়েকে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেন। কিন্তু ইজাজ নামাজে যাওয়ার পর মায়ের অগোচরে নোমানের পাঠানো বার্তা পেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান লাইবা। দীর্ঘক্ষণ না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা অ্যাপের সাহায্যে লাইবার মোবাইল ফোনের অবস্থান চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। বাড়ি ছাড়ার দুই ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বাড়ির অদূরে লাইবার মৃতদেহ খুঁজে পান তাঁর জামাতা জায়েদ বিন আফজাল ও ছোট ভাই। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও আবার চা করে দিতেন। ইজাজ বলেন, ৬ অক্টোবর তাঁরা প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হন। কিন্তু ফিরে এসে স্ত্রী ইজাজকে জানান, নোমানের বার্তা পাওয়ার পর মায়ের আপত্তি সত্ত্বেও লাইবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন। অ্যাপটির মাধ্যমে ফোনটির অবস্থান বাড়ির কাছাকাছি একটি এলাকায় পাওয়া যায়। স্ত্রীকেও বিষয়টি খেয়াল রাখতে বলেন।

তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে এবং ঘটনার তদন্ত শুরু করে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশের পক্ষ থেকে লাইবা আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে ধারণা দেওয়া হলেও পরিবার তা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। জায়েদ বিন আফজাল জানান, উদ্ধারকালে লাইবার শরীরে ও পোশাকে অস্বাভাবিক আলামত ছিল; লাইবা কখনো নিজে আত্মহত্যা করতে পারেন না, বরং নোমানই তাঁকে ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে। আল-জাজিরাকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সিসিটিভি ফুটেজে লাইবাকে একা হাতে মোবাইলফোন নিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে দেখা গেছে। মৃত্যুর আসল কারণ জানতে বিষবিজ্ঞান ও ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে, যা পেতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগবে। তাদের অভিযোগ, প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ওই ব্যক্তিই লাইবাকে হত্যা করেছেন। এরপর শ্বশুরকে দ্রুত ঘটনাস্থলে আসতে বলেন।

লাইবার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার এক দিন পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অভিযুক্ত নোমানকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। পুলিশ ও এফআইএ পৃথক দুটি তদন্ত দল গঠন করে অভিযান চালিয়ে লাইবার মৃত্যুর দুই দিন পর নোমানকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। তবে ২০ অক্টোবর পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান নোমান। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে নোমানকে ছিনিয়ে নিতে তাঁর সহযোগীরা পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালালে সংঘর্ষের মধ্যে নোমান নিহত হন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর নোমানকে নিয়ে তদন্তের কাজে তথ্য-প্রমাণ উদ্ধারে যাওয়ার সময় দুটি মোটরসাইকেলে আসা চার ব্যক্তি গুলি চালান।

পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান

২১ অক্টোবর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি ইসলামাবাদে লাইবার পরিবারের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন। তিনি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করেন এবং নোমানের বাড়ি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে উদ্ধার করা ৫ মিলিয়ন রুপিরও বেশি অর্থ (প্রায় ১৮ হাজার মার্কিন ডলার) লাইবার বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেন। তবে ইজাজ জানান, এই অর্থ তাঁদের জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি পূরণ করতে পারবে না; কারণ টাকার চেয়ে তাঁদের কাছে লাইবার জীবন অনেক বেশি মূল্যবান ছিল। নোমানের মৃত্যুর পরও এই ঘটনার পেছনে আরও কেউ যুক্ত আছে কি না, তা নিয়ে পরিবারের ক্ষোভ রয়ে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত নতুন করে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তুমি কি আমার জন্য এটুকু করতে পারবে না?’। ইজাজ বলেন, ‘এ কথা শোনার পর মনে হয়েছিল, আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে।’। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় এ সংখ্যা ৭৫ শতাংশ বেশি।

পাকিস্তানে শিক্ষা পরামর্শক খাতের নাজুক পরিস্থিতি

লাইবা ইজাজের এই ঘটনাটি পাকিস্তানে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা ইনস্টিটিউটের (আইআইই) তথ্যানুসারে, প্রতি বছর পাকিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে এই ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে পুঁজি করে লাহোর ও ইসলামাবাদসহ বড় শহরগুলোতে ভুয়া ভিসা এজেন্টের সক্রিয়তাও বেড়েছে।

পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ) স্পষ্ট জানিয়েছে যে, অভিযুক্ত নোমান কোনো নিবন্ধিত ভিসা এজেন্ট বা অনুমোদিত কনসালটেন্ট ছিলেন না।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ‘অল পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন অব ফরেন এডুকেশন অ্যান্ড ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্টস’-এর সূত্রমতে, পাকিস্তানে শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর সরকারি আইনের অভাব রয়েছে। লাহোরের শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘কলেজওয়ার্কস’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা নুশমিয়া সুকেরা আল-জাজিরাকে বলেন, উপযুক্ত আইন বা সরকারি তদারকি না থাকায় যে কেউ হঠাৎ করেই পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করতে পারে। তিনি আরও সতর্ক করেন, বিশ্বমানের কোনো নিবন্ধিত শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানই কোনো শিক্ষার্থীকে শতভাগ ভর্তি কিংবা ভিসা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, যা অনেক শিক্ষার্থীই অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন।