মতাদর্শের সংঘাত ও মানবিক সংকটের গল্প ‘ফিয়র্ড’

Published: November 7, 2026, 9:56 am

সমাজে মতাদর্শিক মেরুকরণ দিন দিন গভীর হচ্ছে, যা অন্যের বিশ্বাস ও জীবনযাপনের ওপর নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই অসহিষ্ণু প্রেক্ষাপট নিয়েই রোমানীয় চলচ্চিত্রকার ক্রিস্তিয়ান মুঙ্গিউ নির্মাণ করেছেন তার নতুন চলচ্চিত্র ‘ফিয়র্ড’। ছবিটি মূলত এমন এক সময়ের দলিল, যেখানে ভিন্নমতের মানুষের প্রতি সামাজিক সহনশীলতা দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। এই অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দর্শককে মুঙ্গিউ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—আমাদের বিশ্বাসের বাইরের মানুষের অধিকার রক্ষায় আমরা কি অটল থাকতে পারি? প্রতিবেশীর সন্তান কীভাবে বড় হচ্ছে, পরিবারে ধর্মের ভূমিকা কতটা, কিংবা কোন মূল্যবোধে একজন মানুষ বিশ্বাস করবেন—এসব প্রশ্ন ক্রমেই ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে চলে আসছে। ‘ফোর মান্থস, থ্রি উইকস অ্যান্ড টু ডেজ’ ছবির জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপামজয়ী মুঙ্গিউ এবার বেছে নিয়েছেন নরওয়ের প্রত্যন্ত এক জনপদকে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, শিশুর অধিকার, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সীমা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। সিনেমাটি দর্শকের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রাখে— যে মানুষের বিশ্বাস ও জীবনদর্শনের সঙ্গে আপনার মৌলিক মতবিরোধ রয়েছে, তার অধিকার রক্ষায়ও কি আপনি দাঁড়াবেন।

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে রোমানিয়া থেকে নরওয়ের একটি ছোট শহরে পাড়ি জমানো এক পরিবার। লিসবেট (রেনাতে রেইনসভে) ও মিহাই ঘেওরগিউ (সেবাস্তিয়ান স্ট্যান) তাদের পাঁচ সন্তানকে নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন। লিসবেট স্থানীয় ভাষায় দক্ষ হলেও তার স্বামী মিহাই নতুন সমাজের নিয়মকানুন ও ভাষাগত জটিলতায় কিছুটা পিছিয়ে থাকেন। তাদের জীবনচর্চা স্থানীয়দের তুলনায় রক্ষণশীল; বিশেষ করে সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে না দেওয়া বা বাইবেল পাঠের ওপর জোর দেওয়া স্থানীয় সমাজের কাছে অদ্ভুত ঠেকে। এই সাংস্কৃতিক দূরত্বের সূত্রপাত হয় স্কুলে বড় মেয়ে এলার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যাওয়ার পর, যা পরবর্তী সময়ে আইনি ও রাষ্ট্রীয় জটিলতায় রূপ নেয়। মিহাই অনেক কথাই পুরোপুরি বুঝতে পারেন না; নতুন সমাজের নিয়মকানুন ও মূল্যবোধও তার অপরিচিত। প্রতিদিন বাইবেল পাঠ তাদের পারিবারিক জীবনের অংশ। এমনকি ধর্মীয় পাঠের অগ্রগতি নির্ধারণে সন্তানদের জন্য রয়েছে পয়েন্টভিত্তিক ব্যবস্থা। প্রতিবেশীদের চোখে তাদের জীবনযাপন কিছুটা অস্বাভাবিক।

মিহাই স্বীকার করেন যে, সন্তানদের শাসন করতে বা বিপদ থেকে রক্ষা করতে তিনি মাঝে মাঝে শারীরিক শাস্তি দিয়েছেন। লিসবেটও জানান, রান্নার সময় গরম পানি পড়া বা অন্য কোনো দুর্ঘটনার হাত থেকে সন্তানদের বাঁচাতে তাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। তবে রোমানিয়ার সামাজিক পরিবেশে যা স্বাভাবিক, নরওয়ের কঠোর আইনি কাঠামোয় তা বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। লিখিত জবানবন্দিতে মিহাইয়ের শারীরিক শাস্তির কথা স্বীকারোক্তির পর কর্তৃপক্ষ তাদের পাঁচ সন্তানকে পরিবার থেকে আলাদা করে পালক পরিবারের তত্ত্বাবধানে নিয়ে যায়। এরপরই সিনেমাটি একটি অভিবাসী পরিবারের ব্যক্তিগত সংকট ছাড়িয়ে আদালত, রাষ্ট্র ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রাজনীতির এক বড় ক্যানভাসে পরিণত হয়।

পরিচালক মুঙ্গিউ বিষয়টিকে কেবল সংস্কৃতির লড়াই হিসেবে দেখাননি। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষীয় নজরদারি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। মিহাইয়ের রক্ষণশীল রাজনৈতিক মতামত—যেমন বিয়ে হওয়া উচিত নারী ও পুরুষের মধ্যে—স্কুলে তার সন্তানের মুখে শোনার পর পরিবারের প্রতি কর্তৃপক্ষের সন্দেহ আরও বাড়ে। একজন রোগীর মৃত্যুর পর লিসবেট যখন ধর্মীয় বিশ্বাসের মাধ্যমে অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন সেই মানবিক উদ্যোগটিও তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় প্রচারের অভিযোগে পরিণত হয়। ছবির প্রধান দুই অভিনেতা, রেনাতে রেইনসভে ও সেবাস্তিয়ান স্ট্যান, তাদের অভিনয়ের মাধ্যমে এই মানবিক অসহায়ত্ব ও অস্থিরতাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। বিশেষ করে সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন মিহাইয়ের চরিত্রে স্ট্যানের আত্মসংযমী অভিনয় দর্শকদের গভীরভাবে স্পর্শ করে।

মুঙ্গিউর নির্মাণশৈলীর মূল শক্তি তার অতি নাটকীয়তাহীন সংযত মুহূর্তগুলোতে। মাতৃত্বের শারীরিক ও আবেগিক বিচ্ছেদ লিসবেটের চরিত্রের মাধ্যমে যেভাবে ফুটে উঠেছে, তা রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে গভীর মানবিক বেদনার জন্ম দেয়। পরিচালক কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানোর চেয়ে চরিত্রগুলোকে বোঝার চেষ্টার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ছবিটির কিছু অংশে তত্ত্ব বা রাজনৈতিক বক্তব্য প্রাধান্য পেলেও, এর নির্মাণশৈলী দর্শককে নৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। এটি মূলত সমাজের ভেতরের মতাদর্শিক সংঘাত ও তুষারধসের মতো নেমে আসা অসহিষ্ণুতার এক শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি।

২০২৬ সালের ১৮ মে কান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে ক্রিস্তিয়ান মুঙ্গিউর ‘ফিয়র্ড’ চলচ্চিত্রটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হয়। চলচ্চিত্রটি মর্যাদাপূর্ণ স্বর্ণপাম জয় করে এবং পরবর্তীতে ১৯ আগস্ট ফ্রান্সের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। বর্তমান সময়ের অন্যতম আলোচিত এই চলচ্চিত্রটি প্রমাণ করে যে, ভিন্নমতের অধিকার রক্ষা করাই আধুনিক ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এর অভিঘাত ও পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া যে এখন সময়ের দাবি, তা সিনেমাটি স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়।