ঋত্বিক ঘটকের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে অবিভক্ত বাংলায়, যে সময়টা ছিল নানা দিক থেকে বিভ্রান্তিকর। একদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃজনশীল সাহিত্য ও খ্যাতি তখন চূড়ান্ত শিখরে, অন্যদিকে কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকদের হাত ধরে বাংলা সাহিত্য এক নতুন ধারার সূচনা করছিল। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তীব্র উদ্দীপনা কাজ করছিল, আর গ্রামবাংলার মিথ ও কিংবদন্তি নতুন রূপ পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু এরপরই ধেয়ে আসে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং কংগ্রেস-মুসলিম লীগের রাজনৈতিক বিরোধ, যা পুরো দেশকে বিপর্যস্ত করে দেয়। আমি যখন জন্মেছিলাম, তখনকার সময়টা ছিল বিভ্রান্তিকর।
দেশভাগের মাধ্যমে অর্জিত খণ্ডিত স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে গঙ্গা ও পদ্মার জল ভ্রাতৃঘাতী রক্তপাতে লাল হয়ে উঠেছিল। স্বপ্নভঙ্গের পর ঋত্বিক ঘটক দেখেছিলেন এক মৃতপ্রায় ও জীর্ণ বাংলাকে, যেখানে দারিদ্র্য, কালোবাজারি এবং অসৎ রাজনীতিকদের আধিপত্য দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিজের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতে তিনি সব সময় এই বিভক্ত ও ক্ষতবিক্ষত বাংলার চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, একজন শিল্পী হিসেবে অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাঙালিকে সচেতন করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। মিথ ও কিংবদন্তিতে সমৃদ্ধ গ্রামবাংলাও নতুন জীবনের আশায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা পেলাম খণ্ডিত স্বাধীনতা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এসব ঘটনার আমরা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম। কালোবাজারি ও অসৎ রাজনীতিকেরা সমাজের কর্তৃত্ব দখল করল। মানুষের ভবিষ্যৎ ভরে উঠল দুঃস্বপ্ন ও দুর্ভোগে। পরবর্তী সময়ে আমি যত চলচ্চিত্রই নির্মাণ করেছি, কল্পনায় কিংবা আবেগে কোনোভাবেই এই বাস্তবতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারিনি। বাইরে থেকে মনে হতে পারে, খুব সহজেই আমি নিজের ভাবনা প্রকাশ করেছি। আমরা এদিক-ওদিক বিভিন্ন জায়গায় আউটডোর শুটিং করছিলাম।
চলচ্চিত্র নির্মাণ যে কত বড় মানসিক ও শারীরিক চাপের কাজ, তার অভিজ্ঞতাও তিনি ভাগ করেছেন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ও ‘কোমল গান্ধার’-এর পর ‘সুবর্ণরেখা’ নির্মাণের সময় তিনি প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তখন বাংলায় বিশ্লেষণধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন ছিল। ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রযোজকদের পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রে আগ্রহ কমে আসছিল। এসবের বাইরেও ছিল ব্যক্তিগত স্মৃতির প্রভাব; যেমন ‘সুবর্ণরেখা’র শুটিংয়ের সময় তার ছোট মেয়ের আতঙ্কিত হওয়ার দৃশ্যটি ছবির সীতা চরিত্রের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। প্রতিটি চলচ্চিত্র শেষ করার পর আমাকে প্রচণ্ড মানসিক চাপ ও শারীরিক ক্লান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এ ধরনের চলচ্চিত্রের পরিস্থিতি ও বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে, বিশেষ করে যাঁরা নিজেরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি, তাদের কাছে বোঝানোও কঠিন। তিন-চার লাখ টাকা খরচ করার পর প্রযোজক যদি সেই অর্থ ফেরত না পান, তাহলে পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র নির্মাণে তার আগ্রহ হারিয়ে ফেলাই স্বাভাবিক। ছবিটি বানাতে গিয়ে কী কী সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম, সে কথা আর বলতে চাই না। ছবির কাহিনি তখনো আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।
মহাকালীর প্রসঙ্গ ও পুরাণকাহিনি তার চলচ্চিত্রে বারবার উঠে এসেছে। ‘কোমল গান্ধার’ ছবিতে বিয়ের গান বা মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের মাধ্যমে তিনি অবিভক্ত বাংলার স্মৃতি জাগিয়ে রাখতে চেয়েছেন। রেললাইনের ধারের দৃশ্য কিংবা পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিকভ্রান্ত শিশুদের চিত্রায়নের মাধ্যমে তিনি আধুনিক জীবনের শূন্যতা এবং ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মূল্যবোধের সংকট ফুটিয়ে তুলেছেন। তার মতে, এই পুরাণগুলো আমাদের শিল্পের ভেতরেই গভীরভাবে প্রোথিত।
‘সুবর্ণরেখা’ ছবিটির নির্মাণশৈলী নিয়ে তিনি স্বীকার করেন যে, এর গল্পে প্রবল মেলোড্রামা ছিল। দুটি অধ্যায়ের নানা ঘটনা ও পর্বকে একসূত্রে গেঁথে গল্পটি তৈরি করতে হয়েছিল। তার ভাষ্যমতে, রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ বা ‘নৌকাডুবি’র মতো উপন্যাসেও এমন ঘটনাক্রমের উদাহরণ পাওয়া যায়। তবে সীতা, হরপ্রসাদ ও ঈশ্বরের সমস্যাগুলো যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে হয়তো ঘটনাগুলো দর্শকদের কাছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হতো।
নিজের কাজের বিচার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ছেড়ে দিয়ে ঋত্বিক ঘটক সব সময় নিজের কাছে সৎ থাকার চেষ্টা করেছেন। তার বুদ্ধিবৃত্তিক চলচ্চিত্র ‘কোমল গান্ধার’ সমসাময়িক দর্শকদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া না পেলেও, তিনি বিশ্বাস করতেন দীর্ঘ সময় পর মানুষ ছবিটিকে ভালোভাবে উপলব্ধি করবে। সংকট ও বাধার কাছে আত্মসমর্পণ না করে বরং নিজের বিবেচনাবোধ কাজে লাগিয়ে শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ থাকাই একজন শিল্পীর মূল সংগ্রাম। আশিস রাজাধ্যক্ষ ও অমৃত গাঙ্গার সম্পাদিত গ্রন্থ থেকে এই স্মৃতিকথা সংগৃহীত হয়েছে।





