বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য এবং কালজয়ী নাম ঋত্বিক কুমার ঘটক। ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা এই প্রখ্যাত নির্মাতা তার সৃজনশীলতার মাধ্যমে বাঙালির জীবন, সংগ্রাম, দেশভাগের যন্ত্রণা ও উদ্বাস্তু মানুষের বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে তিনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই সমাজের গভীর সংকট ও মানুষের অন্তরের হাহাকারকে মূর্ত করে তুলেছিলেন।
‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘সুবর্ণরেখা’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের হাতিয়ার নয়, বরং সামাজিক অসঙ্গতি ও ইতিহাসের দলিল তৈরির শক্তিশালী মাধ্যম। এসব ছবিতে ব্যক্তিগত বেদনার পাশাপাশি উঠে এসেছে সময়, সমাজ ও ইতিহাসের নানা সংকট।
১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিভাবান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর বহু বছর পরেও তার নির্মাণশৈলী বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে চলেছে। জীবদ্দশায় প্রাপ্য স্বীকৃতি সীমিত থাকলেও তার নির্মাণশৈলী ও চলচ্চিন্তাভাবনা আজও চলচ্চিত্রপ্রেমী ও নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করে।
আজ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার নিজের লেখা ‘দ্য ফিল্ম আই ওয়ান্ট টু মেক অন ভিয়েতনাম’ থেকে সেই অনন্য পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো। জন্মবার্ষিকীতে এই শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তার লেখাটি এদিন অনলাইন তার বই ‘রোজ অ্যান্ড রোজ অভ ফেন্সিজ’ থেকে ‘দ্য ফিল্ম আই ওয়ান্ট টু মেক অন ভিয়েতনাম’ লেখাটি অনুবাদ করল।
ঋত্বিক ঘটকের নিজস্ব ভাষ্যমতে, ভিয়েতনাম নিয়ে ছবি নির্মাণ করা কেবল একটি শৈল্পিক প্রচেষ্টা নয়, বরং তা এক গভীর পবিত্র দায়িত্ব। গভীরতা ছাড়া বিষয়টি নিয়ে কাজ করাকে তিনি একপ্রকার ঔদ্ধত্য কিংবা পাপ হিসেবে গণ্য করতেন। সংবাদপত্র ও কিছু স্থিরচিত্র থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি দেশটির সংগ্রামের স্পন্দন অনুভব করতে চেয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, ভিয়েতনামের লড়াই শুধু একটি অঞ্চলের যুদ্ধ নয়, বরং তা বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ঘটনা। আজকের দিনে কোনো চলচ্চিত্রকারের কাছে ভিয়েতনাম নিয়ে ছবি নির্মাণের কথা ভাবা এক গভীর ও পবিত্র দায়িত্বের মতো। বিষয়টি নিয়ে হালকাভাবে কথা বলা কিংবা গভীরভাবে না জেনে চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা একধরনের ঔদ্ধত্য, এমনকি পাপও হতে পারে। ভিয়েতনাম সম্পর্কে আমার যা জানা, তার সবই সংবাদপত্র, কয়েকটি ছবি এবং কিছু সাময়িকীর লেখাপত্র থেকে পাওয়া। দেশটির স্পন্দনও কখনো সরাসরি অনুভব করতে পারিনি।
পরিচালক ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উন্মত্ত হিংস্রতা ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলার সাধারণ মানুষের দুঃখ ও হাহাকার ভিয়েতনামের পরিস্থিতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনি এটিকে কোনো বাধা মনে করতেন না, বরং কলকাতার বা বাংলার প্রেক্ষাপটে বসেই তিনি সেই বৈশ্বিক সংগ্রামকে ধারণ করার স্বপ্ন দেখতেন।
তিনি ফ্রান্সের এক বিখ্যাত পরিচালকের নেপোলিয়ন নিয়ে নির্মিতব্য ছবির উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র বা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে বিমূর্ত ভাবনার অবতারণা করা ঝুঁকিপূর্ণ। তার মতে, অনেক তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ভিয়েতনামকে আধুনিক থাকার খেলনা বা ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহার করছেন, যা অত্যন্ত আপত্তিকর। ভিয়েতনামের রক্তাক্ত আর্তনাদ বোঝার ক্ষমতা তাদের নেই বলেই তিনি কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
নিজের চলচ্চিত্রের রূপরেখা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জরাজীর্ণ একটি ঘরে অসুস্থ শিশু ও মায়ের যন্ত্রণার দৃশ্যকল্প তুলে ধরেন। তিনি চেয়েছিলেন শিশুর কান্নার শব্দের ওপর দিয়ে ভেসে আসুক পুলিশের বাঁশির আওয়াজ। চলচ্চিত্রে স্থিরচিত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা ও চলমান জীবনের ছন্দকে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের সংগ্রামী জীবনের অন্ধকার দিকগুলো এবং অপরাধের পেছনে থাকা সামাজিক কারণগুলো উন্মোচন করা।
পরবর্তী পর্যায়ে তিনি স্বপ্ন ও বাস্তবতার এক সংমিশ্রণ ঘটাতে চেয়েছিলেন। ছবির একটি বড় অংশজুড়ে থাকতো সংগীত, নৃত্য ও ছন্দময় পরিবেশনা। সেখানে বাস্তবতার ছাপ না থাকলেও মুক্তিফ্রন্টের যোদ্ধাদের সাহসিকতা ও সংগ্রামের স্পন্দন ফুটে উঠত। শেষাংশে তিনি চেয়েছিলেন হো চি মিনের কবিতার আবৃত্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের লড়াকু মানসিকতাকে চূড়ান্ত রূপ দিতে।
চলচ্চিত্রটির সমাপ্তি টানার ক্ষেত্রে তিনি জীবনের জয়গান গাইতে চেয়েছিলেন। তিনি এমন এক জীবনবোধ ধারণ করতে চেয়েছিলেন, যা মাটির গভীর থেকে রস শুষে নিয়ে কঠিন ইস্পাত ও শ্রমিকের ঘাম থেকে শক্তি সঞ্চয় করে। শেষ দৃশ্য হিসেবে তিনি একজন গুলিবিদ্ধ তরুণকে কল্পনা করেছিলেন, যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার সময়ও মাটি আঁকড়ে ধরবে। সেই রক্তের দাগ থেকেই তিনি জন্ম দিতে চেয়েছিলেন এমন এক ভিয়েতনামের, যার মৃত্যু নেই। অথচ এই লেখায় আমি সেই পাপই করতে যাচ্ছি।





