ঢাকায় ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি মনোরেল রুটের পরিকল্পনা সরকারের

Published: November 6, 2026, 12:26 pm

রাজধানী ঢাকায় ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি মনোরেল রুট নির্মাণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে সরকার। প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে রুট দুটির বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজ চলছে। পরিকল্পিত এই মনোরেল ব্যবস্থা রাজধানীর বিদ্যমান ও ভবিষ্যতের মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সাথে সমন্বয় করে একটি টেকসই গণপরিবহন কাঠামো গড়ে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মশিউর রহমান জানান, প্রস্তাবিত মনোরেল ব্যবস্থা শহরের গণপরিবহন নেটওয়ার্ককে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করবে। এটি একটি পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে যেসব জনবহুল এলাকায় যাত্রীদের চলাচল বেশি, সেসব রুটে এই সেবা সাধারণ মানুষের যাতায়াত অনেক সহজ ও আরামদায়ক করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান মেট্রোরেলের পাশাপাশি অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থার সংযোগ স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। মেট্রোরেল ব্যবহারকারীদের গন্তব্যের শেষ অংশে পৌঁছানোর সুবিধার্থে এই মনোরেল ফিডার হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরামর্শকদের সহায়তায় এই প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই নকশা তৈরির প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি) প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে।

এই কাজের জন্য সরকার রাজস্ব বাজেট থেকে ৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে দুটি রুট নির্বাচন করা হবে। ডিটিসিএ রাজধানীর যান চলাচলের ধরন ও যাত্রী চাহিদার ওপর ভিত্তি করে মডেল ভিত্তিক সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। এরপর সেসব তথ্য বিশ্লেষণের জন্য বুয়েটের পরামর্শকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

‘কনসালট্যান্সি সার্ভিস ফর প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি অব মনোরেল অ্যালাইনমেন্ট ইন্টিগ্রেশন উইথ মাস ট্রানজিট নেটওয়ার্কস ইন ঢাকা মেট্রোপলিটন রিজিয়ন’ শীর্ষক চুক্তির মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিস্তারিত নকশা জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। হালনাগাদ সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) মোট পাঁচটি মনোরেল রুটের প্রস্তাব রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার।

প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত পাঁচটি রুট হলো- পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি হয়ে বিমানবন্দর-বসুন্ধরা (২৫ দশমিক ২ কিমি), মধ্য বাড্ডা-ভুলতা (১৪ দশমিক ৬ কিমি), রামপুরা-ডেমরা (১০ দশমিক ৩ কিমি), মোহাম্মদপুর-পোস্তগোলা (১১ দশমিক ৭ কিমি) এবং উত্তরা সেন্টার হয়ে বিমানবন্দর-সাভার (১৭ দশমিক ৬ কিমি)।

এর বাইরে আরও তিনটি রুটের প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে টিএসসি থেকে কামরাঙ্গীরচর, আলুব্দী থেকে পশ্চিম আগারগাঁও বা শ্যামলী এবং পল্টন থেকে সদরঘাট বা ঝিলমিল পর্যন্ত রুটগুলো অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া প্রস্তাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে কামরাঙ্গীরচর পর্যন্ত ৯টি স্টেশনসহ মনোরেল-৮, আলুব্দী থেকে পশ্চিম আগারগাঁও অথবা শ্যামলী পর্যন্ত ১০টি স্টেশনসহ মনোরেল-১০ এবং পল্টন থেকে সদরঘাট অথবা ঝিলমিল পর্যন্ত ৬ বা ১১টি স্টেশনসহ মনোরেল-১৩ এর কথা উল্লেখ রয়েছে।

বুয়েটের পরামর্শক দল জনসংখ্যা, যাত্রী-আকর্ষণ এলাকা, গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা, যানজটপূর্ণ এলাকা, ডিপো নির্মাণের জমির প্রাপ্যতা এবং ভবিষ্যতের সম্প্রসারণের সুযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে। প্রকল্পের লক্ষ্য হলো রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সড়কের সীমিত জায়গার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটি কার্যকর অবকাঠামো গড়ে তোলা। তাই ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে, যেখানে সড়কের জায়গা সীমিত এবং অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রচলিত গণপরিবহন অবকাঠামো নির্মাণ কঠিন হতে পারে, সেখানে এ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা যাচাই করছে ডিটিসিএ।

সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই সমীক্ষায় রুটের অবস্থান, সম্ভাব্য স্টেশন, ডিপোর স্থান, যাত্রী চাহিদা ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে দেশীয় ও প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে কাজ করছেন। রাজধানীর যানজট নিরসন এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই সরকার ঢাকায় মনোরেল চালুর এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সমীক্ষায় নির্মাণ ব্যয়, যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা, পরিচালন ব্যয় এবং প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক যৌক্তিকতাও মূল্যায়ন করা হবে।