আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেবে না জনগণ: ফটিকছড়িতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন

Published: November 6, 2026, 11:56 am

বাংলাদেশের মানুষ স্বৈরাচার আওয়ামী লীগকে এ দেশে আর রাজনীতি করতে দেবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যারা মানুষ হত্যা, গণহত্যা, গুম, জুলুম ও নির্যাতন করেছে, অথচ এখনো জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি কিংবা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেনি, সেই দলকে এ দেশে রাজনীতি করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলূম বাবুনগর মাদ্রাসার ১০৪তম বার্ষিক দ্বীনি মহাসম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, তারা মুখে এক কথা বলে, কিন্তু তাদের দলিলে কী আছে, সেটি বলে না।

ফ্যাসিবাদী শাসন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ দিন ধরে গুম, খুন ও জঘন্য নির্যাতনের মাধ্যমে পুরো দেশকে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় ফেলে ক্ষমতা থেকে পালিয়ে গেছে। শাপলা চত্বরে অসংখ্য আলেম-ওলামাকে হত্যা করা হয়েছে এবং পবিত্র মসজিদকে রক্তে রক্তাক্ত করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, মতপার্থক্য কিংবা রাজনৈতিক দ্বিমত থাকলেও ফ্যাসিবাদী শক্তির অশুভ প্রত্যাবর্তন ঠেকানোর প্রশ্নে দেশের সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশের সব জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চায় বিএনপি।

বক্তব্যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্জনে ২৩ বছর সময় লেগেছিল। আর পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদী ও আলেম-ওলামাবিরোধী শাসন থেকে জনগণকে মুক্ত করতে লেগেছে দীর্ঘ ১৬ থেকে ১৭ বছর।’ শাপলা চত্বরে বহু আলেম নিজেদের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের অনেকের নাম কিংবা কবরের ঠিকানাও এখনো পর্যন্ত উদঘাটিত হয়নি। হাজার হাজার মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ দেশ অন্যায় শাসন থেকে মুক্তি লাভ করেছে। সরকারকে সহযোগিতা করা যেতে পারে, তবে দেশের মানুষের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করা উচিত নয়।

ক্ষতিগ্রস্তদের পরিসংখ্যান ও আন্তর্জাতিক তথ্য

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছেন। এ ছাড়া বিগত ১৬ থেকে ১৭ বছরের শাসনের মধ্যে প্রায় তিন হাজার মানুষকে গুমের শিকার হতে হয়েছে, যার মধ্যে তিনি নিজেও একজন ভুক্তভোগী ছিলেন। একই সময়ে প্রায় সাত হাজার মানুষ বিভিন্ন ধরনের হত্যাকাণ্ড ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন এবং লাখ লাখ মানুষ রাজনৈতিক হামলা ও মিথ্যা মামলার মাধ্যমে চরম নিপীড়িত হয়েছেন।

রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও অপরাপর দলগুলোর অবস্থান

আওয়ামী লীগের ফের রাজনীতিতে আসার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে সালাহউদ্দিন আহমদ সতর্ক করেন, সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাতে যে শ্রমিক অসন্তোষ ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে, তার পেছনে সেই পলাতক ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রত্যক্ষ ইন্ধন রয়েছে। এই ধরনের চক্রান্ত ও অস্থিরতার বিষয়ে দেশের মানুষকে অত্যন্ত সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা কি আবার সেই ফ্যাসিবাদীদের পুনরাগমন চাই। তাহলে সেই ক্ষেত্র আজকে কারা তৈরি করে দিচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি উল্লেখ করেন, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল ধর্মের নাম ব্যবহার করে রাজনীতি করলেও তাদের দলীয় প্রকাশ্য দলিল বা নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট কোনো শরিয়াভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার অঙ্গিকার দেখা যায় না। তারা এমনকি শরিয়া আইনের স্পষ্ট পক্ষ নেয়নি এবং তাদের মনোগ্রাম থেকেও নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিভাষা বাদ দেওয়া হয়েছে। বিএনপির অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূলবোধের চর্চা শুরু করেছিলেন এবং বিএনপি সংবিধানে ইসলামী মূল্যবোধের পুনঃস্থাপন ও জুলাই জাতীয় সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাতে কাজ করছে। আওয়ামী লীগ সংবিধান থেকে ইসলামী মূল্যবোধের যেসব বিষয় বাদ দিয়েছিল, সেগুলো পুনরায় সংযোজন করা হবে। মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস এবং বিসমিল্লাহও পুনঃস্থাপন করা হবে।

উন্নয়ন পরিকল্পনা ও মহাসম্মেলনে অংশগ্রহণ

আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্দোলনের নামে অযথা দেশে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে। সরকার দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন এবং আলেম-ওলামা ও কওমি শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে।

মহাসম্মেলনে যোগ দেওয়ার পূর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির ও বাবুনগর মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে এক বিশেষ সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং কুশল বিনিময় করেন। সাক্ষাতের পর তিনি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মহাসম্মেলনে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া এবং জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমসহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।