হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে নায়কের সংজ্ঞা বলতে সাধারণত একজন শক্তিশালী ও অপরাজেয় পুরুষকে বোঝানো হতো, যিনি প্রেমিকার জন্য পৃথিবী ওলটপালট করে দিতে পারেন। কিন্তু সেই নায়ক যখন প্রেমে পরাজিত হন, কিংবা নিজের ভুলের মুখোমুখি দাঁড়ান, তখন তিনি কেমন আচরণ করবেন? শাহরুখ খানের দীর্ঘ অভিনয়জীবন আমাদের দেখিয়েছে যে, নায়কের দুর্বলতা বা ব্যর্থতাকেও দর্শকের ভালোবাসার কারণ করে তোলা সম্ভব। অন্যায়ের প্রতিবাদ, প্রতিশোধ, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা কিংবা প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা—তথাকথিত নায়কোচিত পুরুষত্বের এসব বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন সময়ে দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে।
১৯৯৪ সালের ‘কাভি হা কাভি না’ সিনেমায় সুনীল চরিত্রটি এর একটি দারুণ উদাহরণ। সুনীল প্রেমে পড়ে, ঈর্ষান্বিত হয় এবং প্রেম পাওয়ার আশায় অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। তাকে প্রচলিত অর্থে বিজয়ী নায়ক বলা যায় না, বরং সুনীলের অপরিণত আচরণের আড়ালে দর্শক এক অনিশ্চিত ও মানবিক মানুষকে খুঁজে পান। সুনীলের এই ব্যর্থতার গল্পে এক অদ্ভুত মায়া আছে, যা দর্শককে তার পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করে। এক্সপ্লেইনার / মজুরি বোর্ড কীভাবে কাজ করে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে নেয়। সুনীলের মধ্য দিয়ে দর্শক যেন নিজেদের ভুল করারও একটা জায়গা খুঁজে পান।
শাহরুখের তারকাখ্যাতির নেপথ্যে রয়েছে তার অভিনয়ের এই বৈচিত্র্য।
তিনি কেবল প্রেম পাওয়ার আনন্দ নয়, বরং প্রত্যাখ্যানের বেদনা এবং নিজের আবেগের সঙ্গে লড়াই করার যন্ত্রণাকেও পর্দার গল্পের অংশ করেছেন। ২০১৮ সালে ‘সেলিব্রিটি স্টাডিজ’ জার্নালে প্রকাশিত প্রসিদা গোপীনাথের গবেষণাপত্র ‘আ ফিলিং ইউ ক্যাননট রেজিস্ট: শাহরুখ খান, অ্যাফেক্ট, অ্যান্ড দ্য রিস্ক্রিপ্টিং অব মেল স্টারডম ইন হিন্দি সিনেমা’-তে এই বিষয়টির বিশদ বিশ্লেষণ রয়েছে। গবেষক দেখিয়েছেন, শাহরুখের অভিনয়ের মাধ্যমে পুরুষ তারকাখ্যাতির এক নতুন ধরন তৈরি হয়েছে, যেখানে সংবেদনশীলতা ও কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা পুরুষালি আকর্ষণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিজের ইচ্ছামতো তার প্রেম পূর্ণতা পায় না।
তবে পর্দায় দুর্বলতা প্রকাশের অর্থ এই নয় যে, শাহরুখের সব চরিত্রই পুরুষতান্ত্রিক ধারণা ভেঙে দিয়েছে। ১৯৯৩ সালের ‘ডর’ সিনেমার রাহুল চরিত্রটির কথাই ধরা যাক। সেখানে ভালোবাসার আড়ালে রাহুলের অধিকারবোধ ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা তাকে এক ভয়ংকর মানুষে পরিণত করেছিল। এটি আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আবেগের তীব্রতা কি কখনোই কাউকে অন্যের সম্মতি অগ্রাহ্য করার নৈতিক অধিকার দিতে পারে? উত্তরটি স্পষ্টত ‘না’। সুনীল ও রাহুলের চরিত্রের এই বৈপরীত্যই শাহরুখের অভিনয়ের গভীরতাকে ফুটিয়ে তোলে। অথচ পর্দায় সুনীলকে দেখার অভিজ্ঞতা শুধু তার ভুলের হিসাব মেলানোর মধ্যে আটকে থাকে না।
শাহরুখের পর্দার পরিচয় কখনোই এক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’র রাজ, ‘কাল হো না হো’র আমান মাথুর কিংবা ‘মাই নেম ইজ খান’-এর রিজওয়ান খান—প্রতিটি চরিত্রই আবেগের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা প্রকাশ করে। বিশেষ করে রিজওয়ান খানের চরিত্রে যে নির্ভেজাল মানবিকতা ও পরোপকারের ছাপ দেখা যায়, তা প্রচলিত রোমান্টিক নায়কের ছাঁচকে ভেঙে দেয়। এই চরিত্রগুলো কেবল নারীকে জয় করার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্বকেও তুলে ধরেছে।
২০১৭ সালে টেডের মঞ্চে ‘থটস অন হিউম্যানিটি, ফেইম অ্যান্ড লাভ’ শীর্ষক বক্তৃতায় শাহরুখ রসিকতা করে বলেছিলেন, তিনি লাখো মানুষের কাছে স্বপ্ন ও ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে দেন। তার দর্শকেরা তাকে পৃথিবীর সেরা প্রেমিক মনে করেন, আর এই ইমেজটি তিনি ধরে রাখতে চান। তবে ২০২৪ সালে ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার, অ্যাকশন হিরো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং পর্দার তারকাচিত্রের সঙ্গে ব্যক্তিগত সত্তার পার্থক্যের কথা খোলামেলা আলোচনা করেছেন।
পর্দায় একজন পুরুষকে কাঁদতে দেখা কি সমাজ বদলাতে সাহায্য করে? শাহরুখের অভিনয়ের অনেক চরিত্র প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক প্রত্যাশাকে সমর্থন করলেও, কিছু চরিত্র সেই সীমাবদ্ধতাকে ভেঙেছে। ‘লাডলা’ সিনেমায় অনিল কাপুরের রাজু চরিত্রের সঙ্গে ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’র রাজের তুলনা করলে দেখা যায়, রাজের মতো চরিত্রগুলো পুরুষের আবেগ প্রকাশের নতুন পথ উন্মোচন করেছে। যদিও তার অভিনয় কোনো চূড়ান্ত সামাজিক পরিবর্তনের সমাধান নয়, তবুও দর্শককে পুরুষত্বের প্রচলিত ধারণাকে পুনরায় ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে।
গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভের সময় পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা কিংবা আশুলিয়ায় দুজনকে আটকের খবর যেমন সংবাদের বাস্তবতা, তেমনি সাগর-রুনি হত্যার মতো মামলার ১৩১ বারেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হওয়া আমাদের সিস্টেমের ব্যর্থতা। শ্রমিক বিক্ষোভ / গাজীপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন, আশুলিয়ায় আটক ২।
বিনোদন জগতের বাইরেও বাস্তব জীবনের এসব ঘটনা এবং সিনেমার কাল্পনিক চরিত্রগুলো—উভয়ই আমাদের সমাজের ভিন্ন ভিন্ন দিক উন্মোচন করে।
একইভাবে বাংলাদেশের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট স্কোয়াডে ছয় পেসারের অন্তর্ভুক্তি কিংবা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অবনমনের আশঙ্কা নিয়ে টেন হাগের মন্তব্যও পেশাদার জগতের নানা অনিশ্চয়তাকে স্পষ্ট করে। প্রিমিয়ার লিগ থেকে ম্যান ইউনাইটেডের অবনমনের বাস্তব সম্ভাবনা দেখছেন টেন হাগ।
এমনকি অমিতাভ বচ্চনের বুলেটপ্রুফ কাচের পেছনে ভক্তদের দেখা দেওয়া, ১০০ সিনেমার মাইলফলক স্পর্শ করা কিংবা বিপাশা হায়াতের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণের ইচ্ছা—সবই তারকাদের জীবনের বিভিন্ন বাঁক ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে।





