ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো পার্লামেন্টে রেকর্ডসংখ্যক আসন জিতেছে। ১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্টে আরবদের জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম দল মিলে মোট ১৭টি আসন পেতে যাচ্ছে বলে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে বিপুল এই সাফল্য সত্ত্বেও সরকার গঠনের মূল লড়াইয়ে তাদের ভূমিকা এখনও অনিশ্চিত, কারণ মূলধারার ইহুদি দলগুলো তাদের সঙ্গে জোট গড়ার বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছে। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধান ইহুদি দলগুলোর বিরোধিতায় নির্বাচনী সাফল্য সত্ত্বেও সরকার গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
নির্বাচনের প্রাপ্ত আংশিক ফল ও বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট ৫৪টি এবং বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট ৪৯টি আসন পেতে পারে। এদিকে টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্যমতে, নেতানিয়াহুর লিকুদ জোট ৫৩টি এবং আইজেনকটের বিরোধী জোট ৪৮টি আসন পেতে সক্ষম হতে পারে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জাদুকরী সংখ্যা ৬১ নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে আরব দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনের জন্য নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ইহুদি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ জোট পেতে পারে ৫৩ আসন। আর আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেতে পারে ৪৮ আসন। এতে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সীমা অতিক্রম করা সম্ভব।
সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শেকে এবারের নির্বাচনকে আরব ভোটের পুনরুত্থান হিসেবে দেখছেন। তার মতে, দেশটির রাজনৈতিক সমীকরণে এমন বড় জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজ্জারের ভাষ্যমতে, আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে বিরোধীদের অনীহা মূলত আদর্শিক। গাদি আইজেনকট স্পষ্টভাবে আরব দলগুলোর প্রতি আনুগত্যের শর্ত জুড়ে দিয়েছেন এবং তাদের ওপর নির্ভর করার সম্ভাবনা প্রায় নাকচ করেছেন।
প্যালেস্টিনিয়ান ফোরাম ফর ইসরায়েলি স্টাডিজের মহাপরিচালক হোনাইদা ঘানাম জানান, অধিকাংশ ইসরায়েলি দল আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সরকার পরিচালনার বৈধ অংশীদার হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। এই রাজনৈতিক অনীহা ও অবিশ্বাসের দেয়ালই আরব দলগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় বাধা। যদিও টাইমস অব ইসরায়েলের হিসাব বলছে, বিরোধীরা যদি আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় আসে, তবে তাদের আসনসংখ্যা ৬৬-তে পৌঁছে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব।
আরাব দলগুলোর মধ্যে রা’আম নেতা মানসুর আব্বাস আইজেনকটের সরকারে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, বিনিময়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আরবদের হাতে দিতে হবে। অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন যেকোনো মূল্যে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য স্থির করেছেন। তবে নেতানিয়াহু নিজে আরব দলের সমর্থননির্ভর সরকার গঠনকে সরাসরি ‘লজ্জাজনক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং আভিগদর লিবারম্যানের মতো নেতারাও সরকারে কেবল ‘জায়নবাদী’ দল রাখার পক্ষপাতি।
তবে বিরোধী জোটের অংশ ডেমোক্র্যাটস নেতা ইয়ার গোলান আরব ও ইহুদি ভোটের বিভাজন জিইয়ে রাখার নীতির বিরোধী। এর আগেও ২০২১ সালে রা’আমের সমর্থন নিয়ে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ সরকার গঠিত হয়েছিল, যদিও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন নির্বাচন, সংখ্যালঘু সরকার, দলবদল কিংবা জাতীয় ঐক্যের সরকার—এই চারটি বিকল্পের দিকে নজর রাখছেন বিশ্লেষকরা। শেষ পর্যন্ত প্রধান দলগুলোর মধ্যকার সমঝোতাই আরবদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

