সুবর্ণরেখা নিয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরলেন ঋত্বিক ঘটক

Published: November 5, 2026, 11:26 am

বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ‘সুবর্ণরেখা’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা ও মন্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পর নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক এর নেপথ্যের ভাবনা ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন।

তিনি মনে করেন, একজন পরিচালকের প্রকৃত বক্তব্য তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রের ভেতরেই নিহিত থাকে, তবুও সমালোচনার মুখে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অনেকের মতে, এই ছবির মাধ্যমে তিনি হতাশার মতবাদ বা অবক্ষয়ের দর্শন প্রচার করতে চেয়েছেন। তবে ঋত্বিক ঘটক স্পষ্টভাবে জানান, অবক্ষয়ী শিল্পী হওয়ার মতো দুঃসাহস বা হতাশা ছড়িয়ে দেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্য তাঁর নেই। বরং ১৯৪৮ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে যে বিপদ একটি দানবের আকার ধারণ করেছিল, তা তুলে ধরাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতির প্রথম শিকার হয়েছে মানুষের সংবেদনশীলতা, যা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। কয়েকজন বিদগ্ধ দর্শক ছবিটি দেখার পর এবং আমার আগের কিছু লেখা পড়ার পর মনে করেছেন, এই ছবির মধ্য দিয়ে আমি যেন হতাশার একটি মতবাদ প্রচার করতে চেয়েছি। তাদের ধারণা, আমি ‘হতাশা’ ও ‘অবক্ষয়’-এর দর্শনে বিশ্বাসী।অবক্ষয়ের এই ব্যাপারটি আমি বুঝতে পারি না। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে এই বিপদ কীভাবে ধীরে ধীরে এক বিরাট দানবের আকার ধারণ করেছে, সেটিই ধরার চেষ্টা করেছি। আমাদের ভেতর থেকে এই অনুভব করার ক্ষমতা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাজ যতটুকু দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে, এভাবে আমাদের একই গোত্রের বলে পরিচয় করানো শুধু ভুল নয়, তাদের এবং আমার—উভয়ের প্রতিই অন্যায়। আমিও ছবি তৈরি করি, তবে আমার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কে ভালো বা কে মন্দ, সেই বিচার করার প্রশ্ন নেই। প্রশ্নটি হলো, আমাদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়। তবে আমাদের বুদ্ধিমান পাঠকদের বিবেচনার জন্য একটি কথা বলতে চাই। অথচ লন্ডন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার সুযোগ তার ছিল। তাতে তার কাজের কোনো ক্ষতি হয়নি, আমাদেরও হতাশ করেনি। একই সঙ্গে কাকতালীয় ঘটনাটির মধ্যে সামান্য অর্থবহ ইঙ্গিত রেখে তাকে আরও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করেছি।

চলচ্চিত্রটির প্রেক্ষাপট হিসেবে তিনি উদ্বাস্তু সমস্যাকে বেছে নিলেও এর গভীর অর্থ কেবল বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি বলেন, “উদ্বাস্তু! কে উদ্বাস্তু নয়?” এবং “আমরা অসার, অসহায়”—ছবিটির এই সংলাপে তিনি বর্তমান সময়ের মানুষের শেকড়হীনতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ভৌগোলিক সীমানার বাইরে গিয়ে বর্তমান সময়ে প্রত্যেকেই যে বাস্তুচ্যুত, সেই সত্যটিই তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন। দেশের অস্তিত্বের সংকটে আঙুল তুলে দেখানোকে তিনি নিজের পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করেন। তিনি स्पष्ट করেছেন যে, তিনি কোনো স্লোগান খুঁজে বেড়ানো উন্মাদ নন, আবার নিছক মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য ছবি তৈরির ধারণাকেও তিনি প্রতারণা বলে গণ্য করেন।

ছবির কাহিনীতে কাকতালীয় ঘটনার প্রয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাবে ঋত্বিক জানান, এটি এক ধরনের শিল্পকৌশল মাত্র। ভাই তার দেহপসারিনী বোনের কাছে গিয়ে তাকে চিনতে না পারার ঘটনাটি তিনি যান্ত্রিক কাকতালীয় পরিস্থিতি হিসেবে নয়, বরং একটি সাধারণ সত্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। একইভাবে, ‘সুবর্ণরেখা’কে তিনি একটি ক্রনিকল নাটকের আদলে গড়ে তুলেছেন, যেখানে কার্ড বা লিখিত ফলকের মাধ্যমে ঘটনার বয়ান দেওয়া হয়েছে। নিজের পরিকল্পনা ও স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতার মিশ্রণে তিনি এমন এক কাঠামো তৈরি করেছেন, যেখানে কোনো অন্ধকার বা হতাশার জায়গা নেই। এই কাঠামো কতটা অপ্রাসঙ্গিক, তা নিয়ে অনেক আলোচনা শুনেছি। ব্রেখটের থ্রি-পেনি অপেরা নাটকে লন্ডন শহরের কোনো বাস্তব ছাপ নেই। কিন্তু যান্ত্রিক বা বাহ্যিক স্তরে শহরটির খুঁটিনাটি জানাকে তিনি প্রয়োজনীয় মনে করেননি। ছবিটিতে বারবার কাকতালীয় ঘটনার ব্যবহার করা হয়েছে—এমন অভিযোগও আমাকে শুনতে হয়। অনেক সময় কোনো পরিস্থিতির যান্ত্রিক ও উপরিতলের বিবরণ এড়িয়ে যেতে হয়। নিঃসন্দেহে ছবিতে বেশ কিছু কাকতালীয় ঘটনা আছে। ছবির একেবারে শুরু থেকেই সচেতনভাবে দর্শককে এই কাকতালীয় ঘটনার রীতির সঙ্গে পরিচিত করিয়েছি। এটিও একধরনের শিল্পকৌশল—মহাকাব্যিক রীতির কাছাকাছি একটি পদ্ধতি।

ছবিটি নির্মাণের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ‘শিশুতীর্থ’ কবিতা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, যা ছবির সংলাপ, সংগীত ও দৃশ্যসজ্জায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সীতা ও বিরুর মুখের অভিব্যক্তি কিংবা প্রকৃতির ব্যবহার—সবকিছুর মাধ্যমে তিনি হতাশাকে অস্বীকার করার চেষ্টাই করেছেন। এছাড়া ছবিতে ব্যবহৃত বেদ ও উপনিষদের শ্লোকগুলো দর্শককে ছবির অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে সাহায্য করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, তাঁর সৃষ্ট এই শিল্পকর্ম কোনো নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির দাস নয়, বরং সমসাময়িক বিপদের বিরুদ্ধে এক সচেতন প্রতিবাদ।

ঋত্বিক ঘটকের এই বক্তব্যটি ১৯৮৭ সালে চলচ্চিত্র-গবেষক আশিস রাজাধ্যক্ষ ও অমৃত গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদিত ‘ঋত্বিক ঘটক: আর্গুমেন্টস/স্টোরিজ’ সংকলন থেকে সংগৃহীত। এই লেখায় তিনি তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য পরিচালকদের সাথে কাজের তুলনাকেও অন্যায় বলে অভিহিত করেছেন, কারণ দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা থেকেই প্রতিটি শিল্পীর কাজের স্বতন্ত্রতা তৈরি হয়।