বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম সৃজনশীল ও সংবেদনশীল নির্মাতা সেবাস্তিয়ান লেলিও আর আমাদের মাঝে নেই। চিলির এই অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রকার ২০২৬ সালের ৬ নভেম্বর ৫২ বছর বয়সে সান্তিয়াগোর নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন তার জীবনসঙ্গী আমালিয়া কাসাই। তবে এই প্রতিভাবান নির্মাতার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
১৯৭৪ সালের ৮ মার্চ আর্জেন্টিনার মেন্দোসায় জন্মগ্রহণ করেন সেবাস্তিয়ান লেলিও। দুই বছর বয়সেই তিনি পরিবারের সঙ্গে চিলিতে পাড়ি জমান। চিলির ফিল্ম স্কুলে পড়াশোনা শেষে তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন। ২০০৫ সালে ‘লা সাগ্রাদা ফামিলিয়া’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে। এরপর ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গ্লোরিয়া’ চলচ্চিত্রটি তাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে নির্মিত ‘এ ফ্যান্টাস্টিক ওম্যান’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার অর্জন করেন। তার উল্লেখযোগ্য অন্যান্য কাজের তালিকায় রয়েছে ‘ডিসওবিডিয়েন্স’, ‘গ্লোরিয়া বেল’ এবং ‘দ্য ওয়ান্ডার’-এর মতো প্রশংসিত চলচ্চিত্র। জুলিয়ান মুর, র্যাচেল ওয়েইজ ও ফ্লোরেন্স পিউয়ের মতো বিশ্বখ্যাত অভিনয়শিল্পীরা তার নির্দেশনায় কাজ করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ‘পোয়েতা চিলেনো’ নামের নতুন একটি চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করেছিলেন। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া তার চলচ্চিত্র ‘গ্লোরিয়া’ এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নতুন সংস্করণে অভিনয় করেন জুলিয়ান মুর। সঙ্গী খুঁজতে তিনি ঘুরে বেড়ান বিভিন্ন বার ও আড্ডার জায়গায়। এতে রনিট নামের এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন ওয়েইজ।
লেলিওর চলচ্চিত্র মানেই সমাজের প্রথাগত গণ্ডি ভেঙে নতুন করে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। তার প্রতিটি সিনেমাতেই উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার গল্প, যা একই সঙ্গে তীব্র আবেগ ও প্রতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ঋদ্ধ। ২০১৩ সালের ‘গ্লোরিয়া’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি বিবাহবিচ্ছিন্ন এক নারীর জীবনের আনন্দ ও একাকীত্বের গল্প তুলে ধরেন, যা পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ইংরেজি ভাষায় ‘গ্লোরিয়া বেল’ নামে পুনর্নির্মিত হয়। এই ধারায় ২০১৭ সালের অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘এ ফ্যান্টাস্টিক ওম্যান’ ছিল এক অনবদ্য সৃষ্টি। ট্রান্সজেন্ডার শিল্পী দানিয়েলা ভেগা অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি ট্রান্সবিদ্বেষী সমাজের নিষ্ঠুরতাকে এবং শোক প্রকাশের অধিকার নিয়ে এক মর্মস্পর্শী লড়াইকে তুলে ধরেছে। লেলিও তার কাজে শিখিয়েছেন যে, কীভাবে ব্যক্তিগত শোক ও অপমান বৃহত্তর সমাজের বৈষম্যের আয়না হয়ে ওঠে। চিলির পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী পাউলিনা গার্সিয়া অভিনীত ছবিটি ২০১৮ সালে ইংরেজি ভাষায় ‘গ্লোরিয়া বেল’ নামে পুনর্নির্মাণ করেন তিনি। বয়স বাড়লেও জীবনকে উপভোগ করার ইচ্ছা তার কমেনি। ২০১৭ সালে মুক্তি পায় লেলিওর ইংরেজি ভাষার প্রথম চলচ্চিত্র ‘ডিসওবিডিয়েন্স’। ২০২২ সালে মুক্তি পায় তার আরেক ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র ‘দ্য ওয়ান্ডার’। একপর্যায়ে বয়সে বড়, আকর্ষণীয় এক পুরুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এমনকি গল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্মাণ করতেও নির্মাতাকে খুব একটা অসুবিধায় পড়তে হয়নি। সেখানে এক কিশোরী মেয়ে খাবার না খেয়েও দিব্যি সুস্থ আছে বলে দাবি করা হয়। তবে লেলিওর সেরা কাজ কোনটি—এমন প্রশ্নে আমার পছন্দ ২০১৭ সালের ‘উনা মুজের ফানতাস্তিকা’, ইংরেজি নাম ‘এ ফ্যান্টাস্টিক ওম্যান’। ফলে ছবিটি শুধু মধ্যবয়সী একজন নারীর ভালোবাসা খোঁজার গল্প হয়ে থাকে না। পশ্চিমা বিশ্বের অন্য অনেক মানুষ যে স্বাধীনতাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে, চিলির সেই প্রজন্মের কাছে তা কি সত্যিই সহজলভ্য ছিল। বয়স বাড়ার পরও কি নতুন করে আনন্দ, ভালোবাসা ও শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সন্ধান সম্ভব। লেলিও ছবিতে এমন প্রশ্নই সামনে এনেছেন। বাবার মৃত্যুর পর এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যেখানে তার দীর্ঘদিনের গোপন সমকামী পরিচয় ও ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়।
চিলির চলচ্চিত্র ধারায় পাবলো লারাইন বা পাত্রিসিও গুজমানের মতো নির্মাতাদের মতোই লেলিও ছিলেন এক অনন্য নাম। পিনোশের স্বৈরশাসনের সময়কার ক্ষত ও মানসিক যন্ত্রণার প্রভাব চিলির সমাজ ও স্মৃতিতে যেভাবে রয়ে গেছে, লেলিও তা তার সুক্ষ্ম চলচ্চিত্রভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তার কাজে রাজনৈতিক ও সামাজিক জটিলতাগুলো কখনো কখনো সরাসরি, আবার কখনো একান্ত ব্যক্তিগত গল্পের মোড়কে উপস্থাপিত হয়েছে। লন্ডনের রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায়কে ঘিরে নির্মিত ‘ডিসওবিডিয়েন্স’ বা আয়ারল্যান্ডের পটভূমিতে তৈরি ‘দ্য ওয়ান্ডার’-এর মতো চলচ্চিত্রে তিনি নিজ ভূখণ্ডের বাইরে গিয়েও মানুষের আবেগকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে চিত্রায়ন করেছেন। চিলির চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে গত দুই দশকে সৃজনশীলতার এক বিস্ময়কর বিকাশ ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট পিনোশে শাসন কমিউনিজমের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও দেশটির মানুষের জীবনে রেখে গেছে গভীর ক্ষত। পরবর্তী সময়ে চিলি গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে এগোলেও অতীতের সেই ট্রমা মানুষের সামষ্টিক স্মৃতিতে রয়ে গেছে। ১৮৬২ সালের আয়ারল্যান্ডের গ্রামীণ এক জনপদ এর গল্পের পটভূমি। কিন্তু তাদের প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের কারণে সেই সম্পর্ক নানা বাধার মুখে পড়ে। প্রথম দেখায় সিনেমাটিকে চিলির রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে।
লেলিও কেবল একজন দক্ষ নির্মাতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের জীবনের কবি। তিনি তার কাজের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজের প্রচলিত ধারণা ও প্রত্যাশার বাইরে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের সত্তাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। শোক, একাকিত্ব, ভালোবাসা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তিনি কাব্যিক সৌন্দর্য দিয়ে পর্দায় জীবন্ত করে তুলতেন। তার অকাল প্রয়াণ বিশ্ব চলচ্চিত্রের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
পরিশেষে বলা যায়, সেবাস্তিয়ান লেলিওর প্রতিটি কাজই এক একটি নীরব প্রতিবাদ। তিনি এমন সব চরিত্র নিয়ে কাজ করেছেন যারা সমাজের তথাকথিত নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের মতো করে ভালো থাকতে চেয়েছে। তার চলচ্চিত্রগুলো একদিকে যেমন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছে, তেমনি একইভাবে বড় কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছাড়াই একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতাকে পাঠকের বা দর্শকের হৃদয়ে গেঁথে দিতে পেরেছে। এমন মানবতাবাদী একজন নির্মাতার শূন্যতা বাংলাসহ বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে দীর্ঘকাল অনুভূত হবে।





