ফ্রান্সজুড়ে শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বিত বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ বাঁধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে টিয়ার গ্যাস ছুড়তে হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট ৪৪৮ জনকে আটক করা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় ৫৩ জন পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য আহত হয়েছেন। বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা ঠেকাতে এদিন পুরো ফ্রান্সে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিল। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের মতো যেকোনো সহিংস কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করা হবে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ আগেই জানিয়েছিলেন, বিক্ষোভের নামে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে।
বিক্ষোভে মানুষের অংশগ্রহণ নিয়ে সরকারি ও আয়োজক সংগঠনের তথ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। সরকারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন, যার মধ্যে প্যারিসে ছিলেন ৬৫ হাজার। অন্যদিকে, শ্রমিক সংগঠন সিজিটি (CGT) দাবি করেছে, দেশজুড়ে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ১৫ লাখ ৭৩ হাজার ছাড়িয়েছে এবং শুধু প্যারিসেই উপস্থিত ছিলেন প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। রাজধানী প্যারিসে প্লাস দ্য লা রিপাবলিক থেকে প্লাস দ্য লা নাসিওঁ পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিলটি পরিচালিত হয়। বিকেলের দিকে মিছিলের কিছু অংশ সহিংস হয়ে পড়লে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, প্যারিসের বুলেভার্ড ভলতেয়ার এলাকায় পুলিশের অভিযানের সময় অন্তত তিন তরুণ মাথায় আঘাত পান, যাদের স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসাকর্মীরা প্রাথমিক সহায়তা দিয়েছেন। লিয়োঁসহ অন্যান্য শহরেও সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। তবে দিনব্যাপী কর্মসূচির অধিকাংশ অংশ শান্তিপূর্ণ ছিল বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসাকর্মীরা ঘটনাস্থলে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। সরকারি ও আয়োজকদের পরিসংখ্যানে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলেও উভয় হিসাবেই বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি উঠে এসেছে। শুরুতে মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও বিকেলের দিকে কয়েকটি স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের মূলে রয়েছে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, মজুরি স্থবিরতা এবং সরকারি পরিষেবায় বিনিয়োগ কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো। শ্রমিক সংগঠনগুলো মজুরি বৃদ্ধি ও চাকরির সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি পরিষেবায় বিনিয়োগ বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, মানসম্মত পরিবেশ এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিতে রাজপথে সরব হয়েছেন। বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে জনজীবনে; অনেক সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষক কর্মবিরতি পালন করেছেন। এমনকি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সাময়িক প্রভাব পড়েছে। প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারও এদিন বন্ধ রাখা হয়েছিল।
২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ফরাসি সরকার এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ দেশটির রাজনীতির মেরুকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চলমান বিক্ষোভে জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ এবং রাফায়েল গ্লুকসম্যানের মতো প্রথিতযশা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামী ৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু শ্রমিক সংগঠন ও নিয়োগকর্তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সামাজিক সম্মেলনের ডাক দিয়েছেন। মজুরি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে ডাকা এই সম্মেলন কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে ফরাসি রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল।





