মার্কিন নির্বাচনে আরব ও মুসলিম প্রার্থীদের জয়: সিনেটে প্রথম পদচারণা

Published: November 5, 2026, 5:26 am

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেস ও অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় জয়ী হয়ে অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন আরব বংশোদ্ভূত ও মুসলিম প্রার্থীরা। ইসলামভীতি ছড়ানোর অপচেষ্টা এবং নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে চালানো রাজনৈতিক প্রচারণার মুখেই তারা এ সাফল্য অর্জন করেছেন। এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মুসলিম ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। বিজয়ী প্রার্থী হলেন মিশিগানের মিসরীয় বংশোদ্ভূত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক আবদুল আল-সাইয়েদ। নির্বাচনে জয়ী অন্য মুসলিম নারীদের মধ্যে রয়েছেন মিনেসোটার জয়নব মোহাম্মদ, ওহাইওর মুনিরা আবদুল্লাহি, কানেকটিকাটের মরিয়ম খান এবং ডেলাওয়ারের মদিনা উইলসন-অ্যান্টন।

এবারের নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলায় আহত ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের চিকিৎসায় সরাসরি অংশ নেওয়া এক অভিজ্ঞ শল্যচিকিৎসক। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রার্থীও মার্কিন আইনসভায় নিজেদের আসন নিশ্চিত করেছেন।

রাজনৈতিক উস্কানি ও বাধার মুখেই বড় জয়

নির্বাচনি প্রচার চলাকালে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার রাজনৈতিক সমর্থকেরা মুসলিম প্রার্থীদের লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। মিশিগান থেকে জয়ী প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে উগ্রপন্থি বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার মনগড়া ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলে প্রতিপক্ষ। সব বাধা পেরিয়ে অন্তত সাতজন মুসলিম প্রার্থী মার্কিন কংগ্রেসে জয়লাভ করতে সমর্থ হয়েছেন, যার মধ্যে একজন সিনেটর এবং ছয়জন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য।

বিজয়ী উল্লেখযোগ্য আরব ও মুসলিম প্রার্থীদের তালিকা

মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলে জয়ী হওয়া উল্লেখযোগ্য আরব ও মুসলিম বংশোদ্ভূত প্রার্থীরা হলেন আহতদের মধ্যে গুরুতর জখম হওয়া শিশুরাও ছিল।

১. আবদুল আল-সাইয়েদ: মিশিগানের বহুল আলোচিত সিনেট আসনে রিপাবলিকান দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন ৪২ বছর বয়সি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। এই জয়ের মাধ্যমে মার্কিন সিনেটের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নাম লেখালেন তিনি। পেশায় চিকিৎসক আল-সাইয়েদ তার নির্বাচনি প্রচারে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় কমানো এবং রাজনীতিতে বৃহৎ করপোরেট শক্তির অনুদান বন্ধের ওপর জোর দেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও মিসরকে মার্কিন সরকারের দেওয়া সামরিক আর্থিক সহযোগিতার কঠোর সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধীদের উত্থাপিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

২. আদম হামাওয়ি: নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রার্থী গ্রেগ মেলেকে হারিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন মিসরীয় বংশোদ্ভূত শল্যচিকিৎসক আদম হামাওয়ি। নিউ জার্সির ইতিহাস থেকে তিনিই প্রথম মুসলিম কংগ্রেসম্যান। মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক এই সার্জন ২০০৪ সালে ইরাকে সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর বর্তমান সিনেটর ট্যামি ডাকওয়ার্থের প্রাণ বাঁচাতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক হিসেবে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় গিয়ে যুদ্ধাহত ফিলিস্তিনি শিশুদের অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা সেবা দেন।

৩. রাশিদা তালিব: ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট নেত্রী রাশিদা তালিব মিশিগানের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে টানা পঞ্চমবারের মতো জয়ী হয়েছেন। ২০১৮ সালে কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম দুই মুসলিম নারীর একজন ছিলেন তিনি। গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে তিনি মার্কিন কংগ্রেসে সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

৪. ইলহান ওমর: মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হিসেবে আবারও বিজয়ী হয়েছেন সোমালি বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর। রাশিদা তালিবের সঙ্গে তিনিও প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে কংগ্রেসে প্রবেশ করেছিলেন। ইসরাইলকে ঢালাও মার্কিন সামরিক অনুদান দেওয়ার বিরোধিতা করায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে।

৫. দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ে: নিউইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ৩৩ বছর বয়সি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ে। ডোমিনিকান বংশোদ্ভূত এই নারী মার্কিন কংগ্রেসে জয়ী হওয়া প্রথম লাতিনা মুসলিম সদস্য। নাগরিক অধিকার রক্ষা আন্দোলন এবং ফিলিস্তিন সমর্থক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি পরিচিত পান।

৬. আন্দ্রে কারসন ও লতিফা সাইমন: আইনসভার নিম্নকক্ষে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন আরো দুই মুসলিম ডেমোক্র্যাট সদস্য। এদের মধ্যে আন্দ্রে কারসন ২০০৮ সাল থেকে সফলতার সঙ্গে ইন্ডিয়ানার সপ্তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করছেন। অন্যদিকে নাগরিক অধিকারকর্মী লতিফা সাইমন ক্যালিফোর্নিয়ার ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয় নিশ্চিত করেন।

৭. আবের কাওয়াস: ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত সামাজিক উদ্যোক্তা আবের কাওয়াস নিউইয়র্কের ১২তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়েছেন। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে এসে স্থায়ী আবাসন গড়ে তুলেছিল। কাওয়াস তার প্রচারে আবাসন সংকট মেটানো, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, অভিবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং গাজা যুদ্ধে মার্কিন তহবিলের বিরোধিতাকে তুলে ধরেন। পরে তারা যুক্তরাষ্ট্রে বসতি স্থাপন করেন।

৮. আব্বাস আলাউয়েহ: লেবানিজ বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আব্বাস আলাউয়েহ মিশিগানের দ্বিতীয় স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। ডিয়ারবর্ন ও তার আশপাশের এলাকা এই আসনে অন্তর্ভুক্ত। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাইডেন প্রশাসনের ইসরাইল নীতির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘আনকমিটেড’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি। এই নির্বাচনি এলাকার মধ্যে ডিয়ারবর্ন ও আশপাশের কয়েকটি সম্প্রদায় রয়েছে।

৯. নাবিলা সাইয়েদ: ইলিনয়ের ২৬তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে রিপাবলিকান প্রার্থী ডারবি হিলসকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী নাবিলা সাইয়েদ। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মুসলিম নেত্রী এর আগে অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ছিলেন। তার এই জয়ের ফলে আসনটি রিপাবলিকানদের হাত থেকে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় জয় ও প্রতিনিধি নির্বাচন

ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে নিজের কংগ্রেসনাল আসনটি ধরে রেখেছেন আরব বংশোদ্ভূত রিপাবলিকান প্রতিনিধি ড্যারিন লাহুড। তার প্রপিতামহ ও প্রপিতামহী লেবানন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। নিজের এই লেবানিজ ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গভীর গর্বের কথা জানান তিনি। লাহুড বলেন, ‘আমার এই সমৃদ্ধ বংশপরিচয় নিয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত।’ তিনি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্র-লেবানন ফ্রেন্ডশিপ ককাসের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন এবং ওয়াশিংটন ও বৈরুতের মধ্যে পারস্পরিক কূটনৈতিক সখ্য বাড়াতে কাজ করছেন।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভা নির্বাচনে একাধিক ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। তাদের মধ্যে কলোরাডোর ২৯তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে ইমান জোদেহ এবং জর্জিয়ার সপ্তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে রুয়া রোমান বিজয়ী হয়ে মুসলিম ও আরব প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এ ছাড়া টেক্সাসে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আইনপ্রণেতা সালমান ভোজানি ও সুলেমান লালানি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।