‘অযান্ত্রিক’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে টানা বারো বছর ধরে গভীরভাবে ভেবেছিলেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক। যখন এই কাহিনি প্রথম তাঁর কাছে পৌঁছায়, তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা এক নবীন তরুণ। জীবনের সেই প্রারম্ভিক সময়ে হঠাৎ করেই গল্পটি তাঁর সামনে আসে এবং টানা দশ দিন এটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন তিনি। যদিও এর আগেও বিষয়টি তাঁর ভাবনায় উঁকি দিয়েছিল, তবে তা ছিল এলোমেলো ও অসংলগ্ন। গল্পটির অনন্য মেজাজ, ভাষা ও গভীর জীবনদর্শন তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়, যা বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত ধারায় ছিল একেবারেই অচেনা।
আমাদের সাহিত্যের ঐতিহ্যগত পরিসরে মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্কের যে সংঘাত, তার সুনির্দিষ্ট কোনো উপস্থিতি দেখা যায় না। প্রতিষ্ঠিত ধারণায় যন্ত্রকে মানুষের তৈরি এক অমানবিক ও শুষ্ক বস্তু হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। যান্ত্রিক সংস্কৃতি ভিতরের শূন্যতা ও অন্তসারশূন্যতার জন্ম দেয়—এমন ভাবনাই প্রাধান্য পেয়েছে। আধুনিকতা ও যন্ত্রের সাথে এই টানাপোড়েন এখন মৌলিক রূপ নিয়েছে। তিনি মনে করেন, ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতি যন্ত্র নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, ভারতের তরুণ বা ভবিষ্যৎ সমাজ সেই আত্মরক্ষামূলক মানসিকতায় স্থির থাকতে পারে না। ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সাথে নতুন প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটানোর পাশাপাশি মানুষের সাথে যন্ত্রের আত্মিক সম্পর্কের বিষয়েও নতুন করে ভাবা জরুরি।
চলচ্চিত্রটির সহজ-সরল কাহিনীবুনোট এবং মানবিক সহমর্মিতা এক চেনা কিন্তু গভীর জীবনসত্যের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে বিমলের মতো বাস্তব চরিত্রের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিটি দৃশ্যকে নির্মাতার কাছে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই ছবিটি তৈরির সুযোগ আসার সাথে সাথে তিনি কাজে নেমে পড়েন। যদিও আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই চলচ্চিত্র কোনো বাণিজ্যিক লাভ এনে দিতে পারেনি, তবে এটি সৃষ্টির পুরো প্রক্রিয়াই ছিল অত্যন্ত আনন্দদায়ক।
এই ছবি নির্মাণের পেছনে তাঁর মূল কিছু উদ্দেশ্য কাজ করেছিল। প্রথমত, ছোটনাগপুর উপত্যকার অজানা প্রকৃতি ও সেখানকার মানুষের মূল্যবোধকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা। নদীর উপত্যকায় গড়ে ওঠা সেই ভিন্ন পরিবেশ ও সম্পদের বৈচিত্র্যকে নতুনভাবে আবিষ্কার করাই ছিল তাঁর ইচ্ছা, যেন ওখানকার বাসিন্দারা নতুন অভিজ্ঞতার ভাষার সাথে পরিচিত হতে পারেন।
দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি ছিল অঞ্চলের প্রকৃত অধিবাসী অর্থাৎ আদিবাসীদের জীবনকে কেন্দ্র করে। এই আদিবাসী চরিত্রগুলোকে বাদ দিলে মূল কাহিনির কোনো অস্তিত্বই থাকে না। একটি ভাঙাচোরা পুরনো গাড়ির মধ্যে প্রাণ আছে—এই বিশ্বাস কোনো শহুরে মানুষের কাছে নিতান্তই অবাস্তব বা প্রলাপ মনে হতে পারে। তবে শিশুরা কিংবা সরল গ্রামের মানুষ এবং অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাসী আদিবাসীরা সহজেই এটি মেনে নিতে পারে। যন্ত্র সম্পর্কিত আপত্তির সূত্রপাত মূলত সেখানেই, কিন্তু আদিবাসীরা নতুন সবকিছুকে জীবনযাত্রায় সহজভাবে গ্রহণ করে।
মধ্য ভারতের ওরাঁও জনগোষ্ঠীর মাঝে এই ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন তিনি কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। তথ্যচিত্র নির্মাণের সূত্রে টানা পাঁচ বছর তাদের সাথে অবস্থান করার কারণে তাদের সহ্যশক্তি, সংবেদনশীলতা ও জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ফলে বিমলের ভাবনা ও অনুভূতির সাথে আদিবাসীদের চিন্তার মিল তিনি সহজেই খুঁজে পান। ছবিতে তাদের উপস্থিতি এবং তাদের তৈরি বিভিন্ন উঁচু পতাকার শিল্পভাবনাকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তৃতীয়ত, গল্পটির অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিল সেই ভাঙাচোরা গাড়িটি। এই নির্জীব চরিত্রটির উপস্থিতি ছবিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। বিকল হয়ে যাওয়া বা হুট করে অচল হয়ে পড়া গাড়িটিকে ঘিরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ধারণ করা হয়েছিল। এছাড়া চতুর্থ কারণ হিসেবে ছিল পুরনো সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কাজ করার চ্যালেঞ্জ। এই প্রতিবন্ধকতাগুলোই তাঁকে বারবার কাজের নতুন প্রেরণা জোগাত।
সব উপাদান মিলিয়ে পাহাড়ি অঞ্চল, মানুষ এবং সেই অদ্ভুত গাড়িটির কথা বলতে চেয়েছেন নির্মাতা। একসময় সিনেমা হলের বাইরে যখন গাড়িটিকে প্রদর্শনী ট্রাকে রাখা হয়েছিল, তখন সেখানে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। একটি ছোট্ট চড়ুই পাখি শুকনো ডাল নিয়ে এসে গাড়ির হর্নের হাতলে বাসা বাঁধার চেষ্টা করছিল। দৃশ্যটি দেখে চুপচাপ সেখান থেকে চলে এসেছিলেন ঋত্বিক ঘটক, মনে মনে চাইছিলেন পাখিটি যেন ওই গাড়ির ভেতরেই নিজের নীড় গড়ে তোলে।
ছবির শেষ দৃশ্যে জীবনের সেই অবিরাম প্রবাহমানতার সত্য প্রকাশ পায়। পুরনোকে পেছনে ফেলে নতুনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চিরন্তন নিয়ম ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেখানে। ছোট একটি শিশু ভাঙা হর্নের টুকরো নিয়ে খেলার সময় বিমলকে দেখে যেভাবে হাসে, তার মধ্যেই জীবনের মূল সার্থকতা নিহিত। জীবনের শেষ দিনগুলোতে এই গাড়িটি তাঁকে প্রয়াত মায়ের স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দিত, যাদের দুজনের মাঝে ছিল এক অদ্ভুত ও অসংজ্ঞায়িত মিল। (আশিস রাজাধ্যক্ষ ও অমৃত গাঙ্গার সম্পাদিত গ্রন্থ ‘আর্গুমেন্ট/স্টোরিজ: ঋত্বিক ঘটক’ থেকে অনুদিত।)





