মাগুরায় ঐতিহ্যবাহী দিনান্ত ক্লাবের নাম পরিবর্তন, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

Published: November 8, 2026, 3:26 am

মাগুরা জেলা শহরে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ‘দিনান্ত ক্লাব’-এর নামফলক সরিয়ে সেখানে ‘মাগুরা অফিসার্স ক্লাব’ নামে নতুন একটি ফলক স্থাপন করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে শহরের নোমানী ময়দানসংলগ্ন আনসার অফিসের পূর্ব পাশে অবস্থিত ক্লাব ভবনে নতুন এই ক্লাবের ফলক উন্মোচন করেন জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ। এ ঘটনাকে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের আবেগ ও ঐতিহ্যকে অবমাননা হিসেবে অভিহিত করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন মাগুরার সাধারণ মানুষ ও সুধীজন। শনিবার (৭ নভেম্বর) দুপুরে শহরের নোমানী ময়দানসংলগ্ন আনসার অফিসের পূর্ব পাশে ক্লাবের নিজস্ব ভবনে নতুন ক্লাবের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ।

১৯৬৩ সালে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের উদ্যোগে স্থানীয় সুধী সমাজ, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে এই ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শুরুতে এটি ‘স্টেশন ক্লাব’ নামে পরিচিত থাকলেও পরে তা ‘দিনান্ত ক্লাব’ নামে পরিচিতি পায়। নোমানী ময়দানের পাশে ৫২ শতক জমির ওপর নির্মিত ক্লাবটির নিজস্ব ভবন রয়েছে, যা ২০০১ সালে নতুনভাবে নির্মাণ করা হয় এবং ২০০৩ সালে এর সর্বশেষ গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ক্লাবটি কেবল কর্মকর্তাদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং স্থানীয় নাগরিকদের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা, ইনডোর ও আউটডোর খেলাধুলার আয়োজন, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী ও বাংলা নববর্ষ উদযাপনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনা ছিল।

ক্লাবটির গঠনতন্ত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মাগুরার স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং ব্যবসায়ীদের সদস্য হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক এর সভাপতি হলেও ক্লাবটিতে নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা হতো। তবে অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ থেকে ১৭ বছর ধরে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত না করায় ক্লাবের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। এরপর সম্প্রতি জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় প্রস্তাব এনে এটিকে অফিসার্স ক্লাব হিসেবে নতুন রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। গঠনতন্ত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মাগুরার ২৫ বছর বয়সী যেকোনো স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং করদাতা ব্যবসায়ীদের সাধারণ সদস্য হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। যদিও ক্লাব প্রাঙ্গণের লন টেনিস ও ব্যাডমিন্টন মাঠে নিয়মিত খেলাধুলা হতো।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ দাবি করেন, সরকারি চাকরির বিধিমালার কারণে কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা বিনোদন কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে অধিকাংশ জেলায় অফিসার্স ক্লাব রয়েছে। মাগুরায় কর্মকর্তাদের বসার মতো জায়গা ছিল না বিধায় এটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।’ তার মতে, ক্লাবটি একসময় অফিসারদের ব্যবহারের জন্যই তৈরি হয়েছিল, যা দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ফলে তাঁরা সব সময় সবার সঙ্গে মিশতে পারেন না।

জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগকে একতরফা ও স্বৈরতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। ১৯৭৭ সাল থেকে ক্লাবের সদস্য ও সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা নিজেরা অর্থ ও শ্রম দিয়ে এই ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছি। কোনো আলোচনা বা নিয়মনীতি না মেনে জেলা প্রশাসক হঠাৎ ক্লাবটি দখল করে নিয়েছেন, যা অগ্রহণযোগ্য।’ প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এ টি এম মহব্বত আলীও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জানান, ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠানের নাম এভাবে বদলে ফেলা স্থানীয়দের জন্য অপমানজনক। তবে জেলা প্রশাসকের এ যুক্তি মানতে নারাজ স্থানীয় বাসিন্দা, ক্রীড়ানুরাগী ও ক্লাবের প্রবীণ সদস্যরা। দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে জেলা প্রশাসক একতরফা ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির নাম পরিবর্তন করে অফিসার্স ক্লাব করার পাঁয়তারা করছেন। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আহসান হাবীব কিশোর।

বিতর্কের মুখে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনোয়ার হোসেন জানান, কর্মকর্তাদের জন্য ক্লাব থাকতেই পারে, কিন্তু তা অন্য কোথাও করা যেত কি না সে বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন ছিল। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘কোনো আলোচনা ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ’। আমি এ বিষয় নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলব। ’।

স্থানীয়দের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, ক্লাবটিকে যেন জনবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে পুনরায় গঠন করা হয়। এই দাবিতে সংসদ সদস্য মো. মনোয়ার হোসেন, সংস্কৃতিমন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য নিতাই রায় চৌধুরী এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক আলী আহম্মেদের কাছে পাঁচ দফা সংবলিত একটি আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এই নাম পরিবর্তন কেন্দ্র করে মাগুরার সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন গভীর উত্তাপ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।