অক্সফোর্ড ইউনিয়নে কাতারের প্রধানমন্ত্রী: শান্তি কোনো বিলাসিতা নয়

Published: November 8, 2026, 6:56 am

বিশ্বের বর্তমান বিভক্ত পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর ও সমৃদ্ধ ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান বিন জাসিম আল-থানী। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত অক্সফোর্ড ইউনিয়নে আয়োজিত এক বিশেষ বক্তৃতায় তিনি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ছোট কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব ও দায়িত্ব নিয়ে আলোকপাত করেন।

সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ধারণার প্রস্তাবনা

‘একটি বিভক্ত বিশ্বে সমৃদ্ধি: ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহ এবং বৈশ্বিক প্রভাবের মানচিত্র পুনর্নির্ধারণ’ শীর্ষক এই লেকচারে প্রধানমন্ত্রী গতানুগতিক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের বিভাজনকে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। তিনি এমন দেশগুলোকে ‘সমৃদ্ধ রাষ্ট্র’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যারা নিজেদের স্থিতিস্থাপকতা, আধুনিক অবকাঠামো এবং টেকসই অর্থনৈতিক মডেলের মাধ্যমে ক্ষুদ্র আকৃতিকে সুবিধায় রূপান্তর করেছে। এই সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব কেবল নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা নয়, বরং সম্মিলিত ও সুসংগঠিত উপায়ে বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা।

আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রেক্ষাপট

  • ১৯৪৫ সালের পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে নয়, বরং আইন ও উন্মুক্ত বাজারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১২০টির বেশি নতুন দেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে যুক্ত হয়েছে, যা ছোট রাষ্ট্রগুলোকে আধিপত্যবাদ থেকে সুরক্ষা দিয়েছে।
  • বর্তমানে অর্থনৈতিক সুযোগ বিশ্বায়ন হলেও শান্তি ও নিরাপত্তার মূল নিয়ন্ত্রণ মুষ্টিমেয় কিছু শক্তির হাতে কুক্ষিগত, যা ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করছে।
  • মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ হুমকির মুখে পড়ছে, যার খেসারত দিচ্ছে সংঘাতের বাইরের রাষ্ট্রগুলোও।

কাতারের নিজস্ব ভূ-রাজনীতি ও অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের ভবিষ্যৎ কেবল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সাথে গড়ে ওঠা দৃঢ় সম্পর্ক এবং নিজস্ব সক্ষমতার ওপর তা নির্ভর করে। এই উপলব্ধি থেকেই কাতার আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে শান্তিকে মানবতার স্বাভাবিক অবস্থা হিসেবে যারা বিশ্বাস করে না, তারা কাতারসহ মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ও বিভ্রান্তিকর বয়ান প্রচার করছে বলে তিনি সতর্ক করেন।

শান্তি ও স্থিতিশীলতার গুরুত্ব

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, শান্তি ও স্থিতিশীলতা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর টেকসই উন্নয়নের প্রধান শর্ত। বর্তমান সংকটে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ও উত্তেজনা এড়াতে কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, বিশ্বমঞ্চে নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে না থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মাধ্যমেই ইতিহাস গড়া সম্ভব। যুদ্ধ বা সংঘাতকে স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে মেনে না নিয়ে বর্তমান নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তৃতা শেষ করেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে ছোট রাষ্ট্রগুলোর এই নতুন কণ্ঠস্বর আগামী দিনে বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কাতার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এই ইতিবাচক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হচ্ছে। শান্তির এই পথচলায় ছোট রাষ্ট্রগুলোর ঐক্য ও দূরদর্শিতা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।