সৌদি সীমান্তে হুথিদের একের পর এক স্থল অভিযান

Published: November 3, 2026, 3:26 pm

ইয়েমেনের সংঘাতময় পরিস্থিতির পরিধি বাড়িয়ে সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তে একের পর এক স্থল অভিযান পরিচালনা করছে হুথি বিদ্রোহীরা। গত কয়েক মাসে দেশটির বিভিন্ন সীমান্তরক্ষী চৌকিতে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে পশ্চিমা ও আরব বিশ্বের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এসব ছোট আকারের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, যার মধ্যে গত অক্টোবরের শেষের দিকে সংঘটিত একটি হামলা নজরদারি যন্ত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পশ্চিমা ও আরব বিশ্বের দুই কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।

পশ্চিমা এক কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, এসব অভিযানে অংশ নিয়ে হুথিরা সৌদি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যবহৃত হালকা কিছু আগ্নেয়াস্ত্র নিজেদের কবজায় নিয়েছে। যদিও এসব হামলার বিষয়টি এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে সত্যতা নিশ্চিত হলে ইয়েমেন যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতির পর সৌদি ভূখণ্ডে এটি হবে হুথিদের প্রথম কোনো বড় ধরনের স্থল অনুপ্রবেশ ও হামলার ঘটনা। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও শহরে হুথিদের নিয়মিত অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলত, যেখানে তারা স্থল অভিযানও চালিয়েছিল।

ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং বাশা রিপোর্ট রিস্ক অ্যাডভাইজরির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আল-বাশা সৌদি সীমান্তে হুথিদের সামরিক তৎপরতা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হুথিরা পর্যায়ক্রমে হামলার পরিধি ও তীব্রতা বাড়িয়ে চলেছে। শুরুর দিকে তারা দূরপাল্লার ড্রোন এবং স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলেও বর্তমানে মর্টার নিক্ষেপে সক্ষম কোয়াডকপ্টার ও স্নাইপারদের ব্যবহার করছে। আল-বাশা মনে করেন, হুথিরা যুদ্ধের শুরুর দিকের কৌশলে ফিরে এসেছে, যেখানে আকস্মিক হামলা চালিয়ে সামরিক সরঞ্জাম দখল ও জোটের সদস্যদের আটকের পর তারা দ্রুত সরে পড়ত। তার ধারণা, স্থলপথে হামলায় ফিরে আসা হুথিদের জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। আল-বাশা যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সহযোগী ফেলো হিসেবেও কাজ করছেন। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতির নাম অনুসারেই এর নামকরণ করা হয়েছে।

সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো মিত্র দেশগুলোর সামরিক সহায়তার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তুরস্ক ও পাকিস্তান দেশটিতে সামরিক সদস্য এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে। গত সপ্তাহে মিসরের পার্লামেন্টও সৌদি আরবে প্রতিরক্ষামূলক বাহিনী পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি জানিয়েছেন, দামেস্কও এ চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি ভেবে দেখছে। এমনকি পশ্চিমা কর্মকর্তাদের ধারণা, সৌদি সমর্থিত বাহিনীকে সহায়তায় সিরিয়ার বেশ কয়েকজন ড্রোন বিশেষজ্ঞ ইতিমধ্যে ইয়েমেনে পৌঁছেছেন।

সৌদি সীমান্তের বাইরে ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও হুথিরা সামরিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হুথিরা বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের রাজধানী এডেন বন্দরের ৫০ মাইলের মধ্যে অবস্থান নিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর তাইজ ঘেরাও করে রেখেছে। সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় এর আগে শত শত হামলা চালিয়েছে তারা, যেখানে অন্তত ২৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে রিয়াদকে একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলন পর্যন্ত বাতিল করতে হয়েছিল। হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন।

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে হুথিদের পুরোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ঐতিহাসিক দাবির বিষয়টিও উদ্বেগের কারণ। সানাভিত্তিক হুথি প্রশাসন মূলত দেশটির অভ্যন্তরে কার্যক্রম চালালেও সৌদি আরবের আসির, জাজান ও নাজরান প্রদেশ নিয়ে তাদের বিতর্কিত অবস্থান রয়েছে। ১৯৩৪ সালের তায়েফ চুক্তির মাধ্যমে এসব অঞ্চল সৌদি আরবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ইয়েমেনের সাদা প্রদেশের পার্বত্য অঞ্চলে এই শিয়া জায়েদি মতাদর্শের আন্দোলনের উৎপত্তি, যার শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের মহানবী (সা.)-এর বংশধর বা হাশেমি বংশোদ্ভূত বলে দাবি করে থাকে। আন্দোলনটি শিয়া ইসলামের জায়েদি মতাদর্শ অনুসরণ করে। এর মাধ্যমে তারা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের দাবি তুলে ধরে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের এই সীমান্ত অভিযান দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আবারও স্পষ্ট করেছে। দুর্গম ও বিশাল সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা চ্যালেঞ্জিং, তা এসব ঘটনায় উঠে এসেছে। তবে সৌদি মিত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।